ভূমিকম্পের জেরে বিধ্বস্ত প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার। এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মায়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয় ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু বাড়ি, মসজিদ এবং অন্যান্য ভবন ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, মান্দালয়ের অনেক এলাকায় এখনও পৌঁছতে পারেনি উদ্ধারকারী দল। এই জরুরি পরিস্থিতিতে ভারতীয় সেনার অস্থায়ী হাসপাতাল পাঠানো হয়েছে। বায়ুসেনার আরও দু’টি বিমানে করে ওই অস্থায়ী হাসপাতালে ভূমিকম্পে আহতদের জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার জন্য যাচ্ছেন চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ১১৮ জনের একটি দল। এই অস্থায়ী হাসপাতালে ৬০ শয্যার চিকিৎসা পরিষেবার ব্যবস্থা রয়েছে। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর ৮০ জনের একটি দলকে মায়ানমারে পাঠানো হয়েছে উদ্ধারকাজে সাহায্য করার জন্য। ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারের জন্য মায়ানমারের স্থানীয় প্রশাসনকে সাহায্য করে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর এই দল।
এছাড়াও আকাশপথে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে তাঁবু, কম্বল, খাবারের প্যাকেট এবং জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী। এছাড়াও পাঠানো হয়েছে উদ্ধার অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। এর মধ্যে রয়েছে কংক্রিট কাটার যন্ত্র, ড্রিল করার যন্ত্রের সঙ্গে পাঠানো হয়েছে উদ্ধার অভিযানের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সারমেয় দলকেও।
ব্রিগেডিয়ার এইচএস মাভি জানিয়েছেন, যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে মায়ানমার পৌঁছবে ভারতীয় উদ্ধারকারীরা। সেখানে পৌছনোর পরই অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরির কাজ শুরু হয়ে যাবে। বিষয়টি নিয়ে পোস্ট করেছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
ভারতীয় বায়ুসেনার একটি বিমান শনিবার উত্তরপ্রদেশের হিন্দন বায়ুসেনা ঘাঁটি থেকে পৌঁছে গিয়েছে ইয়াঙ্গনে। ১৫ টন ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে মায়ানমারে। সেখানে উদ্ধারকাজে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে ভারত, যার নামকরণ হয়েছে ব্রহ্মা অভিযান। শনিবারই ত্রাণসামগ্রী নিয়ে মায়ানমারের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে ভারতীয় নৌসেনার দু’টি জাহাজ। নৌসেনার জাহাজ আইএনএস সাতপুরা এবং আইএনএস সাবিত্রীর সোমবারের মধ্যেই ইয়াঙ্গনে পৌঁছে যাওয়ার কথা। শনিবার ভোরে ১০ টন ত্রাণ নিয়ে প্রথম জাহাজটি রওনা হয়ে যায়। পরে আরও ৩০ টন ত্রাণ নিয়ে দ্বিতীয় জাহাজটি রওনা দেয় শনিবার বিকেলে। দু’টি জাহাজ মিলিয়ে ৪০ টন ত্রাণ পাঠানো হচ্ছে ভারত থেকে। এ ছাড়া নৌসেনার আরও দু’টি জাহাজকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে আন্দামান-নিকোবর কমান্ডের অন্তর্গত শ্রীবিজয়পুরমে। আগামী দিনে প্রয়োজন মতো সেগুলিকেও পাঠানো হতে পারে মায়ানমারে।
মায়ানমারের সামরিক সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত সেখানে ভূমিকম্পের কারণে মৃতের সংখ্যা ১৬৪৪। আহত প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ। এখনও অনেকের খোঁজ মেলেনি। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জোরকদমে চলছে উদ্ধারকাজ। অনেকেই এখনও ধ্বংসস্তূপে আটকে আছেন বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। মান্দালয় এবং নাইপিড বিমানবন্দর আপাতত বন্ধ রয়েছে। উপগ্রহ চিত্রে দেখা গিয়েছে, নাইপিড বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার ধুলোয় মিশে গিয়েছে। বহু জায়গায় উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতিও সেখানে নেই। শনিবার সেখানে খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারের মরিয়া চেষ্টা করতে দেখা গিয়েছে অনেককে। আমেরিকার জিওলজিক্যাল সার্ভিসের অনুমান, মায়ানমারে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজারের গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এদিকে টানা প্রায় ৪০ ঘণ্টা ধরে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে থাইল্যান্ডের পুলিশ, দমকল ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। সহায়তা করছে আমেরিকার বিশেষ বাহিনীও। কিন্তু ৩০ তলার আবাসন ধসে চারতলা বাড়ির সমান উঁচু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় সেই স্তূপ সরিয়ে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারের কাজ সহজ নয়। তাই এ বার আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে প্রশাসন। ধ্বংসস্তূপের ঠিক কোথায় আটকে রয়েছেন শ্রমিকেরা, তা জানতে রোবট পাঠানো হয়েছে। দিন-রাত ড্রোনের মাধ্যমে চলছে নজরদারি।
ব্যাঙ্ককের হোটেলগুলিতেও ফাটল ধরেছে। সারা বছর ব্যাঙ্ককে পর্যটকদের ভিড় থাকে। এই পরিস্থিতিতে ওই এলাকার অধিকাংশ হোটেলই খালি করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে ফাটল পরীক্ষা করছেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারেরা। নজরদারি চালাচ্ছে প্রশাসনও। শুক্রবার শহরের বহু মানুষ বহুতল ছেড়ে পার্কে বিশেষ শিবিরে রাত কাটিয়েছেন। শনিবার থেকে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। ব্যাঙ্ককের ৯০ শতাংশ রেলপথ সক্রিয় হয়েছে।
শুক্রবার ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে মায়ানমার। তার পর কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ‘আফটারশক’ হয় ৬.৭ মাত্রার। ওই দিন ১০ ঘণ্টায় পর পর ১৪টি ‘আফটারশক’ হয়। ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে জুন্টা সরকার। মায়ানমারে প্রথম সাহায্য পাঠিয়েছে ভারত। আরও চারটি বিমান পাঠানো হতে পারে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মায়ানমার এবং থাইল্যান্ড সরকারকে এই কঠিন পরিস্থিতিতে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন।
ভারতের পাশাপাশি চিন, দক্ষিণ কোরিয়া, আমেরিকা, ইরান, মালয়শিয়া-সহ একাধিক দেশ সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছে। চিন থেকে ৮২ জনের একটি উদ্ধারকারী দলকে পাঠানো হয়েছে মায়ানমারে। সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। মায়ানমারকে প্রয়োজনীয় সাহায্যের বার্তা দিয়েছেন তিনি। দক্ষিণ কোরিয়াও ২০ লক্ষ ডলারের ত্রাণ পাঠানোর কথা জানিয়েছে। মায়ানমারে ৪৯ জনের উদ্ধারকারী দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালয়েশিয়া।