মেলবোর্ন— বক্সিং ডে টেস্ট ম্যাচে ভারতের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে চালকের আসনে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়া ৪৭৪ রান করে প্রথম ইনিংস শেষ করে। আর তার জবাবে দ্বিতীয় দিনের শেষে শুক্রবার ভারতীয় দল পাঁচ উইকেটে ১৬৪ রান করেছে। হাতে অবশ্য এখনও পাঁচটি উইকেট রয়েছে। কিন্তু রোহিত শর্মার ভারত ২১০ রানে পিছিয়ে রয়েছে। যার ফলে বলতেই পারা যায়, ভারতীয় দল কিছুটা চাপে রয়েছে। মেলবোর্নের এই উইকেটে প্যাট কামিন্সরা দাপটের সঙ্গে যেমন খেলেছেন, তেমনই আবার ভারতীয় বোলারদের সেইভাবে বড় জায়গা দেননি। যদি দ্বিতীয় দিনে ভারতীয় দলের বোলাররা অস্ট্রেলিয়াকে কম রানে আউট করে দিতে পারতেন, তাহলে লড়াইয়ে থাকত পুরো খেলাটা, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু ভারতীয় দলের প্রথম সারির ব্যাটসম্যানরা সেভাবে নজর কাড়তে পারলেন না। এমনকি, রোহিত শর্মা আবার তাঁর পুরনো জায়গায় ফিরে এসে ওপেনারের ভূমিকায় মাঠে নামলেও নিজেকে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলেন। যশস্বী জয়সওয়ালের সঙ্গে ওপেন করতে আসেন অধিনায়ক রোহিত শর্মা। যশস্বী যত না সাহসীকতা দেখিয়েছেন, সেই জায়গায় পুরোপুরি ব্যর্থ রোহিত শর্মা। তিনি মাত্র ৩ রান করে প্যাভিলিয়নে ফেরত যান।
সেই মুহূর্তে ভারতীয় দলের রান ছিল মাত্র ৮। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে যশস্বীর সঙ্গে খেলতে থাকেন লোকেশ রাহুল। অনেকেই ভেবেছিলেন, লোকেশ হয়তো বড় রানের একটা অঙ্ক স্কোরবোর্ডে যোগ করতে পারবেন। প্রথমে খেলা দেখে এই ভাবনাটা অমূলক ছিল না। কিন্তু প্যাট কামিন্সের একটা বাইরের বল েখলতে গিয়ে বুঝতেই পারেননি তা উইকেটে প্রবেশ করেছে এবং বোল্ড আউট হয়ে লোকেশ ড্রেসিংরুমে ফেরত যান। তখন তাঁর রান ছিল ২৪। খেলেছেন ৪২টি বল। বিরাট কোহলি নিজের প্রতি আস্থা রেখে খেলার প্রয়াসে প্রথম দিকে বেশ নজর কাড়তে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ধৈর্যচ্যুতি ঘটে যায় কিছুক্ষণ বাদেই। তবে যশস্বী ও কোহলি জুটি ১০২ রান যোগ করেন স্কোরবোর্ডে। যশস্বী আউট হয়ে যান ৮২ রানের মাথায়। অবশ্য নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিতে যশস্বী ৮২ রানে রানআউট হয়ে যান। তিনি খেলেছেন ১১৮টি বল। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে একটি ছক্কা ও ১১টি বাউন্ডারি। যশস্বী আউট হয়ে যাওয়ার পরেই মাত্র ১ রান যোগ হয় ভারতীয় দলে। বিরাট কোহলি স্কট বোল্যান্ডের বলে ক্যাচ তুলে দেন উইকেটরক্ষক অ্যালেক্স ক্যারির হাতে। কোহলি পিছনে তাকিয়ে যখন মাঠ ছাড়ছিলেন তখন স্কোরবোর্ডে ভেসে ওঠে তাঁর ৩৬ রান। তিনি খেলেছেন ৮৬টি বল। মেরেছেন চারটি বাউন্ডারি।
স্বাভাবিকভাবেই এই খেলা খেলেন না বিরাট কোহলি। আসলে যশস্বীর রান আউটটা মেনে নিতে না পারায় তাঁর মনে চাপ সৃষ্টি হয়। সেই কারণেই তারপরেই তিনি আউট হয়ে প্যাভিলিয়নের পথে পা বাড়িয়ে দেন। ভাবা গিয়েছিল নাইট ওয়াচম্যান হিসেবে আকাশদীপ হয়তো উইকেটে টিকে যাবেন। কিন্তু সেই ভাবনা পুরোপুরি ব্যর্থ হল। তিনি শূন্য রানে স্কট বোল্যান্ডের বলে নাথানের হাতে ক্যাচ দিয়ে ড্রেসিং রুমের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যান। এবরে ব্যাট করতে আসেন ঋষভ পন্থ। ঋষভের সঙ্গে জুটি বাঁধেন রবীন্দ্র জাদেজা। ঋষভ ৬ রানে এবং জদেজা ৪ রানে নটআউট থাকেন। ভারতীয় দলের স্কোরবোর্ডে দিনের শেষে ৫ উইকেটে ১৬৪ রান। কিন্তু ভারতীয় দলের তারকা ক্রিকেটারদের অবশ্যই সচেতন হওয়া উচিত ছিল অস্ট্রেলিয়ার এত বড় রানকে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়। কিন্তু সেই ভাবনা তাঁদের মনকে কখনওই জেদের স্তরে নিয়ে যেতে পারেনি। একমাত্র যশস্বী জয়সওয়াল সাহসিকতার পরিচয় দিলেও অন্য ক্রিকেটাররা সেইভাবে নিজেদের প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। লোকেশ রাহুল ও বিরাট কোহলি কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও সেইভাবে নজর কাড়তে পারেননি। ভারত যে চাপে আছে, তা বলাই স্বাভাবিক। তৃতীয় দিনের শেষে ভারতীয় দল বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়ে যদি না খেলতে পারে, তাহলে শুধু লড়াইয়ে নয়, হারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। প্যাট কামিন্স ও বোল্যান্ড দু’টি করে উইকেট নিয়েছেন।
দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই স্টিভ স্মিথ দুরন্ত ভূমিকা নিয়ে শতরানের দিকে পৌঁছে যান। তিনি ১৪০ রান করেন ১৯৭ বলে। তিনি ১৩টি বাউন্ডারি ও তিনটি ছক্কা মেরেছেন। প্যাট কামিন্স মাত্র ১ রানের জন্য অর্ধ শতরান থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এই টেস্টে তাঁর ব্যাট থেকে যেমন রান এসেছে, আবার বোলিংয়েও মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। কামিন্স মাত্র ৬৩ বলে ৪৯ রান করেন। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে সাতটি বাউন্ডারি। অ্যালেক্স ক্যারি স্বচ্ছন্দে খেলছিলেন। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ৩১ রান। অবশ্য তিনি কোনও বাউন্ডারি না মারলেও, এটা ছক্কা মেরেছেন।
আকাশদীপের বলে ঋষভের হাতে ক্যাচ তুলে দেন ক্যারি। মিচেল স্টার্ক ১৫ রানে আউট হয়ে যান। রবীন্দ্র জাদেজার বল সরাসরি উইকেটে আঘাত করে। লিওন ১৩ রানে যশপ্রীত বুমরার বলে এলবিডব্লু হন। বোল্যান্ড ৬ রানে নট আউট থাকেন। অস্ট্রেলিয়া দল ৪৭৪ রান করে ভারতীয় দলকে চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছেন, তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।
খেলার শেষে ভারতের ওপেনার যশস্বী জয়সওয়াল রান আউট হওয়া নিয়ে অনেক কথা উঠেছে। একটা রান নিতে গিয়ে কেন তিনি এইভাবে আউট হলেন, এই প্রশ্ন অনেককে ভাবাচ্ছে। যার ফলে যশস্বী শতরান থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিরাট কোহলি কেন কয়েক ধাপ এগিয়ে এসে আবার ফিরে গেলেন, তার কারণ খুঁজতে হবে। যশস্বী রানআউট হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিরাট কোহলি নিজেও। তাঁর নিজের ভুলেই যশস্বী রানআউট হয়েছেন, সেকথাও শোনা যাচ্ছে। ঘটনাটি ঘটে ৪১তম ওভারে। তখন উইকেটে ব্যাট করছিলেন যশস্বী আর অন্য প্রান্তে বোলার ছিলেন স্কট বোল্যান্ড। ওভরের শেষ বলটি অস্ট্রেলিয়ার জোরে বোলার একটি ফুল লেন্থে করেছিলেন। সামনের পায়ে ভর দিয়ে সহজে বলটি যশস্বী খেলেছিলেন মিড অন অঞ্চলে।
ওখানে ফিল্ডার ছিলেন অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। যেহেতু বলটি একটু দূরে ছিল, তাই কোহলি সংকেত দিয়েছিলেন রান নেওয়ার জন্য। তাই যশস্বী রান নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসেন। কিন্তু তখন কোহলি দু’ধাপ এগিয়ে এসে আবার নিজের জায়গায় ফেরত যান। তার ফলে প্যাট কামিন্স সেই মুহূর্তে বলটি তুলে দেন উইকেটরক্ষক অ্যালেক্স ক্যারিকে। ক্যারি সঙ্গে সঙ্গে উইকেট ভেঙে দেন। রান আউট হন যশস্বী। নিশ্চিতভাবে রান নেওয়ার ক্ষেত্রে যদি তৈরি থাকা যায়, তাহলে উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে আসা উচিত। কিন্তু সেই ঘটনা ঘটল না। যার ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যেই এগিয়ে এসে যশস্বী জয়সওয়াল রানআউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরত যান। ফলে দলের লড়াকু মনোভাবে ফাটল ধরে।