• facebook
  • twitter
Thursday, 3 April, 2025

মোবাইল ভূত

রনির বাবা-মা দেখলেন রাতারাতি রনি একদম বদলে গেছে। ফোন সারাতে দোকানে দিলেন ওর বাবা। তারপর থেকে আর কখনও রনি ফোনে হাত দেয় না।

কাল্পনিক চিত্র

সুদীপ ওম ঘোষ

রনির আজ রেজাল্ট বেরিয়েছে। খুব ভালো রেজাল্ট করেছে সে।‌ এই প্রথমবার ও ইস্কুলে দশের মধ্যে আছে। আনন্দে ওর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। দৌড়তে দৌড়তে এসে ওর মায়ের কাছে যখন মার্কশিট দেখালো ওর মাও প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। এত ভালো রেজাল্ট করবে রনি ওর মা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। সঙ্গে সঙ্গে রনির বাবাকে ফোন করলেন। রেজাল্ট শুনে রনির বাবাও মহা খুশি। এত দ্রুত রনির এতটা পরিবর্তন ওঁরা ভাবতেই পারছেন না।

রনি ক্লাস টু-তে পড়ে। এবার ক্লাস থ্রি হল। ওর ইস্কুলের নাম বিবেকানন্দ মডেল ইস্কুল। রনি আগে শুধুমাত্র ইস্কুল আর বাড়ির পড়া বাদে সর্বক্ষণ মোবাইল দেখতো। ওর মায়ের মোবাইল তো একপ্রকার ওরই হয়ে গেছিল। ওর মা চাইলেও ওর কাছ থেকে ফোন পেতেন না। রনি রিলস ভিডিও, কার্টুন এই সব দেখতো। আর খাওয়ার সময় মোবাইল না দেখলে তো ওর খাওয়াই হতো না। ওর রেজাল্ট একদম ভালো হতো না। টেনেটুনে পাশ নম্বর পেতো। বাড়িতে সবাই ওকে খুব বকাবকি করত। ওর বাবা-মা ওকে নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। বাবা অফিসে কাউকেই গর্ব করে ওর কথা বলতে পারতেন না। কিন্তু আজ ছবিটা পুরো উল্টো। ওর মা এক এক করে পরিচিত সবাইকে ফোন করে রনির রেজাল্টের খবর জানাচ্ছেন। গর্ব করে বলেছেন রনির কথা। মায়ের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক।

পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছে রনি। এতটা খুশি হতে ওর মাকে ও কখনও দেখেনি। মনে মনে ওখানে দাঁড়িয়েই রনি প্রতিজ্ঞা করল, ও এবার থেকে মন দিয়েই পড়াশোনা করবে। মোবাইল ফোন আর দেখবেই না। যে বাবাকে আগে কিছু আনতে বললে রাগ করতেন, সেই বাবা-ই আজ রনির রেজাল্ট শুনে বলেছেন, সন্ধ্যায় রনির ফেভারিট ওদের মোড়ের মাথার দোকান থেকে মটন বিরিয়ানি নিয়ে আসবেন। কথাটা রনিকে ওর মা বলেছেন। কিন্তু রনির এই বিরাট পরিবর্তন কীভাবে হল সেটা ওর বাবা-মা কিন্তু আদৌ‌কেউই জানেন না।

সেদিনের সেই রাতের কথা মনে পড়ল রনির। ঘুম আসছিল না। বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়েছেন। ও চুপিচুপি উঠে মায়ের মোবাইল নিয়ে রিলস্ দেখছিল। ওর পড়ার টেবিলেই বসে মোবাইল দেখছিল।‌ হঠাৎই একটা ভিডিওতে ও আটকে যায়। ভিডিওটি কিছুতেই ও সেখান থেকে সরাতে পারছিল না। একটা বিকট দর্শনধারী মুখ ওকে যেন কিছু বলছে! রনি ভাষাটা বুঝতে পারছে না। বারবার বলছে। তারপর প্রচণ্ড রেগে গিয়ে মূর্তিটা দুটো হাত বার করে রনির দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। রনি পালাতে পারছে না। বিকট চিৎকার করে উঠল। ফোনটা হাত থেকে পড়ে গেল।

ওর বাবা-মায়ের ঘুম ভেঙে গেল। ওঁরা অত রাতে ফোন নিয়ে বসার জন্য ওকে খুব বকাবকি করলেন। ভয়ে দরদর করে ঘামতে লাগলো রনি। ওর বাবা-মা ওরকম করছে কেন জানতে চাইলেন। কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। অদৃশ্য কেউ একজন যেন ওর মুখ আটকে দিল।

পরের দিন থেকে রনির বাবা-মা দেখলেন রাতারাতি রনি একদম বদলে গেছে। ফোন সারাতে দোকানে দিলেন ওর বাবা। তারপর থেকে আর কখনও রনি ফোনে হাত দেয় না। মন দিয়ে পড়াশোনা করে। ইস্কুল থেকে ভালো রিপোর্ট আসছে। বিকেলে কয়েক ঘণ্টা মাঠে খেলতে যায়। বন্ধুরাও ওকে পেয়ে খুব খুশি। আগে মাঠেও খেলতে যেত না। সব সময়ই ও মোবাইল দেখতো।‌

ওর বাবা-মা রনির কাছে অনেকবার জানতে চেয়েছিলেন সেদিন রাতে কী হয়েছিল? রনি অনেক চেষ্টা করেও কিছুই বলতে পারেনি। কিন্তু রনি পরে বুঝতে পেরেছিল, রনিকে সেই বিকট মূর্তিটা ফোনে হাত দিতে বারণ করেছিল।
আজ ওর ভালো রেজাল্ট করে মনে হচ্ছে, বাবা-মায়ের মুখের এই হাসিটাই ওর কাছে সবচেয়ে দামি। এই পৃথিবীর সবচেয়ে দামি উপহার। ও সবসময় চেষ্টা করবে বাবা-মায়ের মুখের হাসিটাকে ধরে রাখার। পড়াশোনা করে বড় হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। তারপর নিজের আয় করা টাকায় একটা মোবাইল কিনবে।