• facebook
  • twitter
Thursday, 3 April, 2025

দেখবি আর জ্বলবি…

শরিফোঁ কো গরিবি মে / শরাফৎ কম নহি হোতি / কর দো সোনে কা সও টুকরো / পর কিমৎ কম নহি হোতি। মানে, দারিদ্র্যের মধ্যেও সজ্জন মানুষের সৌজন্যে ঘাটতি থাকে না।

কাল্পনিক চিত্র

নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়

গ্রামে সাহিত্যসভা সাঙ্গ করে, সন্ধ্যায় শহরের দিকে ফিরছি সম্পাদক মশায়ের গাড়িতে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে খানিক ঝিমুনি আসছে, এমন সময়ে সামনের লরিটার পশ্চাদ্দেশে লেখা দুটি পঙক্তি পেছন থেকে এসে পড়া আলোয় ঝলসে উঠলো বলেই আমাদের মুখে হাসি ফুসকে ওঠে। ‘ওরে পাগল, পথ কি তোর একার? ঘুম পেয়েছে তো চা খা!’
কবিতা করার চেষ্টা হয়েছে। ছন্দ পুরোপুরি না মিললেও কথাটা এমনই আন্তরিক এবং সময়োপযোগী যে সব্বার মনের ঠিক ভেতরটায় গিয়ে বিঁধেছে। সকলেই অল্প অল্প হাসছি দেখে সম্পাদক মশাই মোক্ষম কথাটি বললেন, দ্যাখো, তোমাদের অনেকের লেখা গ্রাসরুট ইমোশানের লেভেলে ঠিক এই জায়গাটা ধরতে পারে না বলেই কিন্তু কিছু কমিউনিকেট করে না!

তাই তো! মা কারও একার হন না, জানি। তাই বলে পথটাও? এবং পথিককে পাগল বলে ডাকবার দার্শনিক সাহসটাও ওই লরি-শিল্পীর? কী সাংঘাতিক! দেখবি আর জ্বলবি, লুচির মতন ফুলবি, বলার মতন কমন হিংসে হিংসে ভাব এখানে নেই। অবশ্য বুঝি না, লুচির মতন ফুলে ওঠা কী এমন খারাপ। দেখতে ভালো না হোক, কতো লুচিই তো না ফুলেই চুপসে যায়, তুবড়ে তৈলাক্ত হয়। খেতে মন্দ নয় তো! ডোন্ট কিস মি— ইংরিজিতে লেখা দেখেছি অটোর পেছনে। সম্প্রতি এক সহচর দেখেছেন, তার ঠিক পাশেই না কি লেখা, বাবাকে বলে দেব।

সত্যি, ছেলেমানুষি আর গেল না! রাখে কেষ্ট মারে কে, লিখে রাখা অবশ্য বুড়োমানুষি নয় তা বলে। হিন্দি-অঞ্চলে সেই কবে থেকে দেখছি, লেখা থাকে রাম-রথ। পথে যেতে যেতে ভূতপ্রেত হানা দিতে পারে, তাই হয়তো রাম নাম। এটা ছেলেমানুষি না বুড়োমানুষি, বোঝা মুশকিল, তবে ইদানিং সবাই রাজনীতিমনস্ক হয়ে উঠেছে— এমনটা নয়। লেখাগুলো অনেককাল আগে থেকেই লেখা হচ্ছে।

যাই হোক, লরি-সাহিত্য বা কাব্য-কণিকার কথাতেই ফেরা যাক। ঠাকুরদেবতা, লতাপাতা-গাছপালা, নৌকো, চাঁদ, ময়ূর, বাঘ, সিংহ, এইসব ছবির পাশাপাশি বা বিকল্প রূপ: সত্যম শিবম সুন্দরম, মায়ের আশিস, Live & Let Live, এমন কত কী। বিচিত্রমুখী সংস্কৃতির বিশাল এই দেশে, লরি-সাহিত্যে মানুষের কতো না রঙ্গরস সুখদুঃখ সাধ-আহ্লাদের ছাপ দেখা যায়। কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক :
বুলবুল কি জিন্দগি হ্যায় চম্পা কি ডাল মে / ড্রাইভার কি জিন্দগি হ্যায় মোটর কি চাল মে …
জীবন-দর্শনটি বাংলায় লিখলে, এইরকম শোনাবে :
বুলবুলির জীবন দোলে চাঁপাগাছের ডালে/ ড্রাইভারের জীবন বাঁধা মোটরগাড়ির চালে।
চাল মানে, চলন, নিশ্চয়ই বুঝেছেন। আরেকটি নমুনা :
ফুল হ্যায় গুলাবকা, সুগন্ধ লিজিয়ে/ গাড়ি হ্যায় টি-মার্কা, সাইড দিজিয়ে। মোটামুটি অনুবাদ করেছি:
গোলাপফুল যদি হয়, সুবাসটুকু নিন/ এই গাড়ি যে টি-মার্কা, খানিকটা পাশ দিন।

গাড়ি শুধু গাড়ি নয়, ভালোবাসার ফুল, এইরকম পঙক্তি নিশ্চয় অনেক দেখেছেন। ধন্য সেই কবি-কল্পনা, ডিজেল-পোড়া ধুলোর গন্ধে যে গোলাপ সুবাস খুঁজতে বলে। হিন্দিতে লেখা দেখেছি : ইয়ে গাড়ি নেহি, মহব্বত কা ফুল। জীওন কা ফুল-ও লেখা থাকে কোথাও কোথাও। এইভাবেই অযান্ত্রিকের গল্প অজানিতে লেখা হয়ে যায়। দেবতাকে প্রিয় করে গাড়িতে লটকে রাখার প্রবণতাও থাকে। সদা ভবানী দাহিনে / সম্মুখে রহত গণেশ / পাঁচ দেও রক্ষা করে / ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ। অথবা, ভোলে শঙ্কর ভুল না জানা / গাড়ি ছোড়কর কভি নেহি জানা। অনুবাদ করলাম : হে শিবঠাকুর, ভুলিয়া যেও না / এই গাড়ি ছেড়ে তুমি কোথাওই যেও না। শিবঠাকুরের বদলে ভোলে বাবা বললে ধ্বনিমাধুর্য বাড়ত, বাবার ভুলে যাবার প্রবণতার দিকে কটাক্ষও করা যেত। কিন্তু, ঠাকুর রাগ করেন যদি! ঠাকুরদেবতাকে প্রিয়জন ধরে নিয়ে ঠাট্টা-ইয়ার্কি হিন্দি বলয়েই বেশি, বাংলায় ততো দেখি না।

মেদিনীপুর জেলার পশ্চিমপ্রান্তে, লোধাশুলি পেরিয়ে, চিচিরা গ্রামে একদা বাণিজ্যিক কর দপ্তরের চেক পোস্ট ছিল। অষ্টপ্রহর অনেক ছোট বড় হাল্কা ভারি লরির মেলা, প্রতিনিয়ত ঘ্যাঁসঘোষ নির্ঘোষ। বরাকর, ডুবুরদিহিতেও ছিল অমন। পথেই জীবন, পথেই মরণ আমাদের… গানটির সার্থকতা বোঝা যায়, যখন দেখতাম ড্রাইভার খালাসিরা উনুন বানিয়ে রান্নাবান্না করছে, স্নান করছে— দু’তিন দিন আটকে থাকার সুবাদে। লরি-অঙ্গে উচ্চাঙ্গের কাব্য-কণিকা দেখে আলাপ করি আঠাশ বছর বয়সি ইয়াসিন মিয়াঁর সঙ্গে। ওড়িশার জাজপুরে তার সদ্য নিকাহ করা বিবি, বয়স্ক আব্বা ও আম্মাজান। ভালো গায়ক হতে চেয়েছিল সে, কিন্তু চারটি প্রাণীর দানাপানি জোটাতে সে হয়ে গেছে অল ইন্ডিয়া পারমিট ট্রাকের ড্রাইভার। নিজেরই অন্তরের কথা সে যেন লরি–ললাটে লিপিবদ্ধ করেছে: লিখা পরদেশ কিসমত মে/ ওয়াতন কো ইয়াদ কেয়া করনা/ যাঁহা বেদরদ হাকিম হো/ ওঁহা ফরিয়াদ কেয়া করনা। অর্থাৎ :
বিদেশ যদি ভাগ্যে থাকে, কী লাভ আমার স্বদেশ স্মরে! / হাকিম যদি নির্দয় হন, কী লাভ আমার নালিশ করে!

আরেকটি নমুনা : রঙ লাতি হ্যায় মেহদি / উতর যানে কা বাদ / মুহব্বত ইয়াদ আতি হ্যায় / বিছড় যানে কে বাদ। এর মানে : মেহেন্দি রঙ অঙ্গে লাগে মেহেন্দি উঠে যাবার পর, প্রেমের স্মৃতির বাড়বাড়ন্ত বিচ্ছেদটি ঘটলে পর। ইয়াসিন মিয়াঁর আরেকটি : চাঁদনি চাঁদ সে হোতি হ্যায়/ সিঁতারো সে নহি / মুহব্বত এক সে হোতি হ্যায় / হাজারোঁ সে নহি। এর অর্থ : একটি চাঁদেই জ্যোৎস্না জেনো, হাজার তারায় কক্ষনো নয় / সহস্র প্রেম? মিথ্যে! জেনো, একজনেরই সঙ্গে তা হয়…
বিপজ্জনক কথা! আমার মতন অনেকেই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। মিয়াঁর বিবিটি সৌভাগ্যবতী, বোঝাই যাচ্ছে! প্রেমের মানুষ না হয় একজনই রইলো, কিন্তু এই যে চোখের সামনে খুলে যেতে থাকা দিগন্তবিস্তারী পথ, এই যে পথের অনন্ত নেশা, এও কি আসলে প্রেম নয়? মিয়াঁ নিরুত্তর, এ তার জীবিকা–দায় যে! যাই হোক, সংগ্রহ করা আরও দুটি কাব্য–কণিকা বলে কথা শেষ করি।

বুলবুল কুরবান হো যাতে হ্যাঁয় / অপনে চমন কে লিয়ে / ফির হম কিঁউ না কুরবান হো / অপনে ওয়াতনকে লিয়ে। অর্থাৎ : বুলবুল পাখি তার বাসার জন্য আত্মাহুতি দেয়, নিজের দেশের জন্য আমিও তা করব না কেন? কবি দেশপ্রেমিক, বোঝা যাচ্ছে।

শরিফোঁ কো গরিবি মে / শরাফৎ কম নহি হোতি / কর দো সোনে কা সও টুকরো / পর কিমৎ কম নহি হোতি। মানে, দারিদ্র্যের মধ্যেও সজ্জন মানুষের সৌজন্যে ঘাটতি থাকে না। যেমন, সোনাকে শত টুকরো করলেও তার মূল্য থাকে একই। ছন্দ মেলালাম না ইচ্ছে করেই। পথের কবিরা ইচ্ছেমতন ছন্দে বেঁধে নিন না! খুঁজে আনুন আরও অনেক ভালো ভালো কথা, যা ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে বাতাসে! বুরি নজরওয়ালে তেরা মুহ কালা বলে কমন গালি না পেড়ে, ওইসব সরস বাক্যগুলোই লরিতে পেড়ে ফেলা ভালো। দেখো, মগর পেয়ার সে। জীবনকে এর চেয়ে বেশি ভালোভাবে দেখতে শেখায় আর কে?