• facebook
  • twitter
Thursday, 3 April, 2025

‘কাঁটাচামচ’

‘স্যার, মেয়েকে আমি বড্ড ভালোবাসি। পারমিতা আর নেহা এই দুজনকে নিয়েই আমার একটা গোটা পৃথিবী ছিল। একজনকে তো আমি হারিয়ে ফেলেছি।

প্রতীকী চিত্র

সোহম পাল

পারমিতা নিজের গলাটা চেপে ধরে হতবাক দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। ‘এটা তুমি করতে পারলে?’ ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে তখন গলা থেকে। গলার ঠিক মাঝ বরাবর গেথে আছে একটা কাঁটাচামচ। নেহা ওকে ধরার চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না। তার আগেই দেহটা মাটিতে পড়ে কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করতে লাগলো। ধীরে ধীরে সব কিছু কেমন যেন ঝাপসা হয়ে এলো আর সঙ্গে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো গরম রক্তের স্রোত।

আমি ইন্সপেক্টর তমাল দস্তিদার। বাড়ি ফেরার জন্য সবে চেয়ার ছেড়ে উঠেছি, হঠাৎ একটি পুরুষ কণ্ঠস্বর কানে এলো, ‘স্যার, আমাকে অ্যারেস্ট করুন… আমি এক্ষুনি একটা খুন করেছি।’ হাঁফাতে হাঁফাতে কথাগুলো বললো আগন্তুক। আমি এবার চোখ তুলে তাকালাম ওর দিকে। ঘামে পুরো জামা ভিজে চপচপ করছে। বিশ্বাসই করা যায় না, এই রাত ১০টার সময় একজন ভদ্রলোক থানায় এসে বলছে, সে নাকি কাকে খুন করেছে।

এবার আগন্তুক হাত জোড় করে কাঁদতে আরম্ভ করলো, ‘দয়া করে এক্ষুনি আমায় অ্যারেস্ট করে নিন স্যার, নাহলে আমি আবার হয়তো কাউকে খুন করে ফেলবো।’ আমি তাকে শান্ত হতে বলে, তার দিকে জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিলাম।
‘এতো রাতে হঠাৎ কাকে খুন করলেন আপনি?’ বাইকের চাবিটা আঙুলের মধ্যে ঘোরাতে ঘোরাতে প্রশ্ন করলাম।
‘আমার বউকে।’
‘আচ্ছা, তারপর মারলেনটা কীভাবে?’

লোকটাকে দেখে একটু নার্ভাস লাগলো, এক ঢোক জল খেয়ে সে বললো, ‘কাঁটাচামচ গলার মাঝখানে গেঁথে দিয়ে…।’ বাইকের চাবি ঘোরানো বন্ধ করে আবার ওর মুখের দিকে তাকালাম। আমি শুধু চুপ করে চেয়ে আছি দেখে, সে আবার হাত জোড় করে বললো, ‘স্যার, আমি একটা খুনি, আমি বউটাকে মেরে আমাদের বাগানে পুঁতে দিয়েছি।’
আমি আবার বাইকের চাবি ঘোরাতে শুরু করলাম। লোকটার কথা আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। মনে হতে লাগলো, লোকটা যেন একটা বদ্ধ পাগল, রাতবিরেতে উজবুকের মতো কথা বলছে।

‘স্যার, আমি অপরাধী। আমাকে অ্যারেস্ট করে নিন।’
এবার আমি বাইকের চাবিটা পকেটে ঢুকিয়ে সোজা হয়ে বসে বললাম, ‘দেখুন, অমন করে অ্যারেস্ট করতে বললেই তো আর অ্যারেস্ট করা যায় না, উপযুক্ত প্রমান লাগে।’

‘অবশ্যই স্যার, আমার নাম প্রতিম হালদার। বিজয়পুরে যে খেলার মাঠটা আছে, ওর পাশেই আমার বাড়ি…’ কথাটা শুনেই এবার আমি চমকে উঠলাম। লোকটার কথার মাঝেই প্রশ্ন করলাম, ‘আপনার স্ত্রী তো কাল থেকে নিখোঁজ, আপনি আজকে তাহলে তাকে খুন করলেন কিভাবে?’

‘মানে? একি বলছেন আপনি?’ প্রতিম অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো।
আমি নিস্পলক চোখে তার দিকে তাকালাম, ‘আপনি নিজেই কাল রাতে আমাদের ফোনে বললেন আপনার স্ত্রী নিখোঁজ, সঙ্গে একটা নাম্বারও দিলেন। সেটা থেকে নাকি আপনার স্ত্রীকে কারা ব্ল্যাকমেল করতো!’

‘না, না, এ সম্ভব না, আমি কাল কোনো ফোনই করিনি আপনাদের। কি বলছেন স্যার?’
‘আচ্ছা দাঁড়ান তাহলে’ বলেই নির্মলকে নোট রাখার ডায়রিটা আনতে বললাম…
‘এই দেখুন, আপনিই কাল রাতে আমাদের ফোন করে এই নম্বরটা দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন, এই নম্বর থেকে ফোন করেই নাকি আপনার স্ত্রীকে কারা ব্ল্যাকমেল করে।’

‘নাইন এইট সেভেন ফোর… এ কি স্যার! এটা তো আমারই নম্বর…’ প্রতিম বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠলো প্রায়।
কিছু একটা ভাবলো প্রতিম, তারপর মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলো। তাকে ওরকম করে বসে থাকতে দেখে আমি বললাম, ‘প্রতিমবাবু আপনি আজ বাড়ি চলে যান, কাল সকালে আমি আপনার বাড়ি যাবো।’

এরপর আর বেশি কথা না বাড়িয়ে প্রতিম উঠে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আমি আবার পিছন থেকে ডাক দিলাম তাকে, ‘আর শুনুন’। ঘুরে দাঁড়ালো প্রতিম। ‘যদি পারেন, ভালো একটা সাইক্রিয়াটিস্ট দেখিয়ে নেবেন, আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে আপনার মাথার ঠিক নেই।’
‘কিন্তু স্যার, সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে তো আমাকে প্রায়ই যেতে হয়।’
‘পোস্টমর্টেম রিপোর্টটার কি খবর নির্মল? কোনো আপডেট?’ চেয়ারে বসতে বসতে প্রশ্নটা করলেন ইন্সপেক্টর তমাল দস্তিদার।

‘ইয়েস স্যার, কাঁটাচামচটা এমনভাবে গেঁথেছে যে, কাঁটাগুলো একদম কণ্ঠনালী ভেদ করে ফেলেছে, সেই কারণেই মৃত্যুটা ঘটেছে।’
‘কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট?’
‘হ্যা স্যার, পাওয়া গেছে।’
‘ভেরি গুড।’
প্রতিম আসার পরদিন সকালেই আমি আর নির্মল গেছিলাম ওর বাড়ি। ওর মেয়েই দরজা খুলেছিলো। আমরা দুজন সিভিল ড্রেসে থাকায়, তেমন কোনো সমস্যাই হয়নি।

‘তোমার বাবা কোথায় মা?’ আমিই ওকে প্রথম প্রশ্ন করলাম।
‘কাকু বাবা তো একটু বাজারে গেছে, তোমরা ভিতরে আসো… বাবা এক্ষুনি চলে আসবে।’
‘তোমার নাম কি মা?’
‘আমার নাম নেহা।’
বেশ মিষ্টি মেয়েটা, বয়স আন্দাজ বারো-তেরো হবে।
‘তুমি কি খাবার খাচ্ছিলে?’ এই প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটা উপর নিচে ঘাড় নাড়ালো।
‘তাহলে খেয়ে নাও যাও, আমরা এখানে বসছি“

নেহা আবার খেতে বসলো। আমরা ঠিক ওর সামনের চেয়ারটা টেনে বসলাম। কাঁটাচামচ দিয়ে ম্যাগি খাচ্ছে ও। মেয়েটার চোখ দুটো যেন ভারী শান্ত। একমনে ও শুধু খেয়েই গেলো, আমাদের দিকে একবারও তাকালো না।
আমিই প্রথম কথা বললাম, ‘আচ্ছা নেহা, তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো? মাকে নাকি বাবাকে?’
ও শুধু একবার মুখ তুলে তাকিয়ে বললো, ‘বাবা’, তারপর আবার খেতে শুরু করলো।
‘মাকে ভালোবাসো না?’ এই প্রশ্ন শুনে মেয়েটার খাওয়া যেন কিছুক্ষনের জন্য থেমে গেলো। ও মাথা নেড়ে ‘না’ জানিয়ে দিলো।

‘কেন মাকে ভালোবাসো না কেন?’
‘মা ভালো না, মা পচা… আমাকে শুধু বকে আর মারে।’
‘এ বাবা এটা তো খুব খারাপ ব্যাপার। আচ্ছা নেহা তোমার মাকে দু’দিন ধরে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তুমি মাকে শেষ কোথায় দেখেছো?’

কোনো কিছু না ভেবেই নেহা বারান্দার দিকে নির্দেশ করে বললো, ‘ওখানে।’
নেহা কাঁটাচামচটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কি যেন দেখছে ওর মধ্যে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘বারান্দায় কি দেখলে?’
‘মা আছে আর….অনেক রক্ত…অনেক।’
‘বাবা তখন কোথায় ছিল নেহা?’
‘বাবা বসে ছিল মায়ের পাশে।’

এরপরই প্রতিম ফিরে আসে বাজার থেকে, তাই ওর মেয়ের সঙ্গে আর বেশি কথা বলা হয়ে ওঠেনি। বাগান খুঁড়ে সত্যিই পাওয়া গেছিল এক মহিলার দেহ, আর সঙ্গে সেই কাঁটাচামচটাও, যেটা দিয়ে খুন করা হয়েছিল তাকে। কিন্তু সব থেকে বড়ো ব্যাপারটা হলো, ফরেনসিক পরে জানায়, মৃত্যু ঘটেছে দুই থেকে তিনদিন আগে। কিন্তু প্রতিম তো কাল রাতেই এসে জানায়, সে নাকি তার বউকে খুন করেছে। প্রতিমকে সেদিন অ্যারেস্ট করা হয়। তবুও আমার মনে একটা খটকা থেকেই যায়, একজন নিজের স্ত্রীকে মেরে মাটিতে পুঁতে দেওয়ার এক-দুদিন পর এসে কেন নিজের অপরাধ স্বীকার করলো? আর বাবাকে পুলিশ অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাচ্ছে দেখেও মেয়ে কিভাবে অতো শান্ত হয়ে খেলনা বাটি খেলে?… যেনো এগুলো সবই আগের থেকে ঠিক করেই রাখা। পুরো পরিবারটাই কি পাগল নাকি কে জানে?

‘মে আই কাম ইন স্যার?’ নির্মলের ডাকে হুঁশ ফিরলো আমার।
‘এসো এসো, ব্যাপারটা ঠিক অতটা সহজ নয় নির্মল, কিছু একটা গণ্ডগোল আছে। বাই দ্য ওয়ে, প্রতিমের অফিসের লোক কি বলছে?’
‘বলছে, ওই সময়টা ও নাকি অফিসেই ছিল। সেদিন নাকি ওর কাজের অনেক প্রেসার ছিল, তা সত্ত্বেও একটা ফোন পেয়ে… খুব বড় ইমার্জেন্সি বলে অফিস থেকে বেরিয়ে যায়।’
‘আমি বুঝতেই পেরেছি ও মিথ্যা কথা বলছে, একজন লোক একই সময় দুজায়গায় থাকবে কি করে? নেহা কোথায় আছে এখন?’

‘নেহাকে ওর এক পিসি নিয়ে গেছেন। ভদ্রমহিলা বিয়ে করেননি, কিন্তু তিনি বড়ো মাপের একজন সাইক্রিয়াটিস্ট।’
‘ও তাহলে কি প্রতিমের বাড়িতে যেই সাইক্রিয়াটিস্টের প্রেসক্রিপশনগুলো পাওয়া গেছে, ওগুলো ওনারই?’
‘ইয়েস স্যার, কিন্তু স্যার গণ্ডগোলটা অন্য জায়গায়…’
‘মানে? কি বলতে চাইছো নির্মল? একটু খুলে বলো তো!’
‘স্যার, প্রেসক্রিপশনে পেশেন্টের নাম কিন্তু প্রতিম হালদার নয়…’

‘প্রতিম হালদার নয়? তাহলে পেশেন্টটা কে? দেখি প্রেসক্রিপশনের ফাইলটা দাওতো আমাকে একবার।’
অবাক হয়ে প্রেসক্রিপশনের পেশেন্টের নামটা দেখেই চমকে উঠলাম, সেখানে পেশেন্ট নামে লেখা: নেহা হালদার।
সময় নষ্ট করলাম না, প্রতিমের সেলের দিকে রওনা দিলাম। নির্মলকে বলে গেলাম, ‘তুমি এক কাজ করো, প্রতিমের ফোনটা একবার চেক করো তো, যদি কিছু পাও… আমাকে জানিও।’

প্রতিমের সেলের তালা খুলে আমি ভিতরে এলাম, কিন্তু প্রতিম আমায় দেখেও যেন না দেখার ভান করলো।
‘সাইক্রিয়াটিস্টের পেশেন্টটা তো আপনি নন প্রতিমবাবু? সত্যি কিন্তু বেশিদিন লুকানো যায় না প্রতিমবাবু, একদিন না একদিন সবাই সত্যিটা জানবেই।’

প্রতিম এবার কান্নায় ভেঙে পড়লো, ‘স্যার, আমি আর পারমিতা ইউনিভার্সিটি থেকে দু’জন দু’জনকে চিনি। আমরা পরস্পরকে খুব ভালোবাসতাম, বিশ্বাস করুন। ওর বাড়ি থেকে মেনে না নিলেও, আমরা পালিয়ে বিয়ে করি। তারপর যখন নেহা জন্মালো, আমার আর আনন্দের সীমা ছিল না। ভেবেছিলাম, পৃথিবীর সব কিছু পেয়ে গেছি আমি, আমার আর কিছুর দরকার নেই।’

প্রতিম এবার মুখ তুলে একবার আমার দিকে তাকালো, ওর চোখ দুটো কান্নায় ফেটে পড়ছে। ‘ছোট বয়সে নেহার কোনো রোগ ধরা পড়েনি। কিন্তু ও যতো বড়ো হতে লাগলো, ততোই যেন ও হিংস্র হয়ে উঠতে লাগলো। একটুতেই কেমন যেন রাগে কাঁপতে থাকতো আর সব থেকে বড়ো ব্যাপারটা কি জানেন? রক্ত দেখলে ওকে আর সামলানো যেতো না। একবার তো একটা ব্লেড হাতের কাছে পেয়ে নিজের হাত কেটে সেই রক্ত নিজের সারা মুখে লাগিয়ে বসে ছিল। সেই দৃশ্য দেখে ভয়ে আমার সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।’

একবার চোখটা মুছে নিলো প্রতিম, তারপর আবার বলা শুরু করলো, ‘তারপর থেকেই আমার বোনই নেহার ট্রিটমেন্ট করে। প্রথমদিকে বুঝিয়ে কাজ হয়ে যেত। যত দিন গেলো, বুঝিয়েও আর কাজ হলো না। তারপর আর কোনো উপায় না পেয়ে বোন ওকে একটা ইনজেকশন দিতে শুরু করলো। সপ্তাহে দুইবার ওই ইনজেকশন দিতে হতো। আমিই নিয়ে যেতাম ওকে বোনের কাছে। নেহা কিন্তু ওই ইনজেকশন নিতে চাইতো না, রাগে কাঁপতে থাকতো ওর শরীর। আমাকে যেহেতু খুব ভালোবাসতো ও, তাই আমার উপর কোনো হিংস্রতা কোনোদিন ও দেখায়নি।’

‘কিন্তু ওই ইনজেকশনটা কিসের?’…আমি প্রতিমের কথার মাঝেই প্রশ্ন করলাম।
‘স্যার, ওই ইনজেকশনটা ওর নার্ভগুলোকে দুর্বল করে দিতো। সারাদিন ওকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে রাখতো। সেই কারণে ওর রাগ অনেকটাই কম হতো। কিন্তু ইনজেকশনের রিঅ্যাকশন কাটতে কাটতে না কাটতেই আবার যে কে সেই। সেদিনও হয়তো সেরকমটাই হয়েছিল।’ বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো ও।

‘আপনি সেদিন যখন অফিসে ছিলেন, আপনার কাছে একটা ফোন আসে। সেটা কে করেছিল? একটু খুলে বলুন প্রতিমবাবু।’

‘আমার মেয়ে নেহা। আসলে ও ঠিক করে খেতে চাইতো না। সেকারণে পারমিতা প্রায়ই ওকে বকাবকি করতো। আমি অনেকবার ওকে বারণ করেছিলাম। কিন্তু সেদিন হয়তো ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গিয়েছিল। নেহার আমার নম্বর মুখস্থ। ও প্রায়ই দুপুরে আমি অফিসে থাকলে আমাকে ফোন করে গল্প করতো। সেদিনও প্রতিদিনের মতোই বাড়ির ল্যান্ডলাইন নম্বর থেকে আমার কাছে ফোন আসে। কিন্তু সেদিন ওর গলায় রাগ আর হিংস্রতা স্পষ্ট ছিল। ও বলেছিলো, পারমিতা নাকি সেদিন খাওয়াতে গিয়ে ওকে একটা চড় মেরেছিলো। আর তখনই নেহা ওর হাতে থাকা কাঁটাচামচটা বসিয়ে দেয় ওর মায়ের গলায়। আমি একটুও সময় নষ্ট না করে ছুটেছিলাম বাড়ির দিকে। গিয়ে চোখের সামনে যা দেখলাম, তা কোনোদিনই ভুলবো না। বারান্দায় পরে আছে পারমিতার দেহটা, ওর মুখ আর গলা থেকে বেরিয়ে এসেছে গরম রক্তের স্রোত। আর বিছানায় রক্ত মাখা মুখে খেলনাবাটি খেলছে নেহা।’

অনেকক্ষণ সব চুপচাপ। আমি ভাবতেই পারছি না যে, ওই টুকু একটা মেয়ে এরমটা করতে পারে। তারপর ফিরে চাইলাম প্রতিমের দিকে। ও হাঁ করে উপরের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি শুধু বললাম, ‘তাই বলে আপনি নেহার করা খুনটা নিজের ঘাড়ে তুলে নিলেন?’

‘স্যার, মেয়েকে আমি বড্ড ভালোবাসি। পারমিতা আর নেহা এই দুজনকে নিয়েই আমার একটা গোটা পৃথিবী ছিল। একজনকে তো আমি হারিয়ে ফেলেছি। আরেকজনকে আমি হারাই কিভাবে বলুনতো? ও চলে গেলে আমার আর এই জীবনের কোনো মূল্যই থাকতো না।’

‘কিন্তু প্রতিমবাবু ও তো বাচ্চা মেয়ে, ও হয়তো বেশিদিন শাস্তিও পেতো না।‘
‘স্যার, একজন বাবা হয়ে নিজের মেয়েকে শাস্তি পেতে দেখাটা কি স্বাভাবিক? আর পুলিশের কাছে একবার ধরা পড়লে, আমার মেয়েটাকে আর বাঁচানো যাবে না। তার থেকে ও ওর পিসির কাছেই থাকুক, ওখানে ও ভালো থাকবে। বোন বলেছিলো, নেহাকে নিয়ে ও আমেরিকা চলে যাবে। সেখানেই ওর চিকিৎসা হবে। তারপরই দেখবেন স্যার আমার মেয়ে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে। আর কোনো অসুবিধাই হবে না। আর ও ভালো থাকলেই আমার পারমিতাটা চিরকাল ওর মধ্যেই বেঁচে থাকবে।’

আমি আর কিছু বলতে পারলাম না, নির্বাক হয়ে সেল থেকে বেরিয়ে এলাম।
নিজের চেয়ারে বসে কি জানি ভাবছিলাম, হঠাৎ নির্মল কিছুটা ছুটেই আমার ঘরে ঢুকলো, ‘স্যার, আপনার কথা মতো প্রতিমের ফোনটা চেক করছিলাম, হটাৎ একটা অজানা ল্যান্ডলাইন নম্বর থেকে ফোন ঢুকছে ওর মোবাইলে।’

‘কই দেখি’, বলে ফোনটা ওর হাত থেকে নিয়ে রিসিভ করতেই ওই দিক থেকে শুনতে পেলাম বছর বারো-তেরোর একটি বাচ্চা মেয়ের কন্ঠস্বর, গলার আওয়াজ যেনো রাগে কাঁপছে…
‘হ্যালো বাবা, পিসি খুব পচা…আমাকে জোর করে ইনজেকশন দিচ্ছিলো। মায়ের মতো কাঁটাচামচ…’
লাইনটা মনে হয় কেটে গেলো, কিন্তু আমার আর বুঝতে কোনো অসুবিধাই হলো না।