রূপসনাতন রায়বর্মণ
ব্যাগের চেনটা একটুখানি খুলে দেখাল অভিজিৎ। থরে থরে ঠাসা পাঁচশো টাকার নোট। উত্তরবঙ্গ থেকে বাসে এখনই সে নেমেছে, এসেছে আমাদের সল্টলেকের অফিসে। সকাল সকাল আমাকে দেখে, যেন বেশ ভরসা পেয়ে বলল, পনেরো মিনিটের জন্যে এটা তোমার জিম্মায় রাখো, আমি করুণাময়ী টার্মিনাস থেকে স্নানটান করে আসছি…
বুকের ভেতর ধুকপুকুনিটা বাড়তে থাকলো পনেরো সেকেন্ড পর থেকে। গুছিয়ে বলতে পারলাম না, সারা রাত্তির জার্নি করে ফ্রেশ হবার জন্যে বাসের টার্মিনাসে যাবার কী দরকার? অফিসেই তো ফ্লোরে ফ্লোরে কত টয়লেট, এমন কি স্নানের জায়গাও আছে, আমিও তো এইভাবে কতবার…
নানান দিকে এগিয়ে নেওয়া যায় গল্পটা। পনেরো মিনিটেই মানুষের ব্লাডপ্রেশার, শুগার যে কতখানি বেড়ে যেতে পারে বিপর্যস্ত অবস্থায়, বুঝিয়েছিলেন বেহালার বারিকপাড়া রোড নিবাসী নারায়ণ মুখোপাধ্যায়। ছোটখাটো চেহারার, ফর্সা, অনেকদিনের চেনা লেখক মানুষটিকে পেয়েছিলাম আকস্মিকভাবে একদিন লোকাল ট্রেনের জানালার ধারে। খড়দহ স্টেশনের টিকিট কাউন্টার একটা মাত্র খোলা, দুপুরবেলা বলেই; ইছাপুর যাবার সর্বনিম্ন মূল্যের যে টিকিট, সে তাঁদের কাছে নেই। এমনিই চলে যান, বলতেই আমি চেঁচামেচি শুরু করি, লিখে দিন বরং এই কথাটাই! টিকিট কাটতে গিয়ে একটা ট্রেন চলে গেল, এটাই রাগের কারণ। কাগজে টিকিট লিখে দিতে দিতেই অবশ্য পরের ট্রেনের ঘোষণা হল। খুব ফাঁকা, আর তাতেই লেখক মশাইকে পেয়ে গেলাম! চেঁচামেচিটুকু বাদ দিয়ে আমার আচরণে তিনি খুশি, তখনই এসেছিল সেই পনেরো মিনিটের টেনশান কথা। কবিতাসভায় যেতে শরীরে মনে খামোখা ওই চাপ নেব কেন? আমিও ভাবছি, আগের ট্রেনে এমনিই উঠে পড়লে, পনেরো মিনিটের লেখক সান্নিধ্য তো পেতাম না!
অভিজিৎ, সেও কবিতা লিখত অল্পসল্প। ছোটদের জন্যে লেখা গল্প কবিতা ছড়া, বেরিয়েছে নানান পত্রপত্রিকায়। ওকে নিয়ে বলতে শুরু করলে উপন্যাস লেখা হয়ে যাবে। ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যায়, বেশ কবছর হল ও এই পৃথিবীর বাইরে। একা থাকতে থাকতে, অসময়ে। আড়াই দিনের যত কবিলেখক আজকাল দেড় পাতা লিখে না উঠেই স্টেজে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে হাততালি চান, অভিজিতের চলন ছিল তার বিপরীতে। লিখত লুকিয়ে লুকিয়ে। ওর স্ত্রী টের পেতেন, চাইতেন, আমার মতন অফ বিট সঙ্গিসাথি ওর আরও থাকুক। আমাদের মতন অনেকের উৎসাহে একটা ছোটদের কাগজও বার করেছিল। অনিয়মিত। শিলিগুড়ি থেকে আমরা অনেকেই যখন কলকাতার দিকে চলে এলাম, দলটা গেল ভেঙে। একা একা, একটা কিছু নিয়ে মেতে থাকতে, অভিজিৎ তখন নিজের বাড়িতে দুর্গাপূজার আয়োজন করলো। হোহো করে হেসেছিল সহচরদের কেউ কেউ। ওই ব্যাগের মধ্যে থরে থরে যা ঠাসা, তার অল্পই লাগে একটা কাগজ ছাপিয়ে বার করতে; বরং পুজার আয়োজনে ব্যবহার করা যায় অনেকটাই। কারও কাছে তো আর হিসেব দাখিল করতে হচ্ছে না!
অভিজিতের সঙ্গে আমার আলাপ কিন্তু স্থানীয় এক কবিসভাতেই। অবাক হয়ে জেনেছিলাম, সে আমার কলিগ। সমবয়সি হলেও চাকরির হিসেবে অনুজ। অফিসে কোনোদিনও দেখিনি তো! আমার কৌতূহলের জবাবে ওর আত্মঅবলোপী ছোট্ট কথা, শিলিগুড়িতে থাকি। পনেরো দিন ডিউটি, বাকি পনেরো দিন এখানে…
স্পষ্ট বুঝলাম না বলেই ঘাঁটালাম না আর। বিচিত্র ঘটনাচক্রে কত অদ্ভুত যোগাযোগই না ঘটে যায়! পথ দুর্ঘটনার খবরটা এখানকার কাগজে ছোট করেই বেরিয়েছিল, অফিসে গিয়ে জানলাম জলপাইগুড়ির কাছে আমাদেরই অফিসের গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েছে, আহতদের একজন অভিজিৎ, যার বাড়ি আমার এলাকায়। স্বভাবতই ব্যাপক শোরগোল তুলি। বাজারে, দোকানে, সাহিত্যসভায় আমার মুখেই সবাই খবরটা শোনে। অফিসের লোকজনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ঘটে। আমি নিমিত্তমাত্র; তবে সর্বাঙ্গে ব্যান্ডেজ বাঁধা গৃহবন্দী অভিজিতের সঙ্গে আড্ডা দিতে কয়েকদিন অফিস ফেরত গিয়েছি। বেশ অনেকদিনের বন্দীদশা; কিছুটা সেরে উঠতেই সে সিদ্ধান্ত নিলো, খড়দহর পাট একেবারে তুলে দিয়ে, সপরিবার শিলিগুড়ি গিয়ে বসবাস করবে। বহুত খরচাপাতি হয়ে গেছে। উশুল করে নিতে হবে, প্রাণে যখন বেঁচে গেলাম এযাত্রা…
ব্যাগে ব্যাগে, গোছা গোছা নোটের ঘটনা, অনেকেই জানতো। উত্তরবাংলার ব্যাপারটাই আলাদা, আলোচনা হতো কলকাতার কলিগমহলে। চিকেন্স নেক, এতখানি আন্তর্জাতিক সীমান্ত,পাশের রাজ্যে উগ্রপন্থী তৎপরতা, ড্রাগস এবং আরও কতকিছুর চোরাচালান, সবটাই যেন ওপেন সিক্রেট। নিজের চোখে অবশ্য আরও অন্যরকম অনেককিছু দেখলাম, অনুভব করলাম। সবটাই ভিন্ন ভিন্ন রোমাঞ্চকর গল্পের বিষয়, বরং যে ব্যাগের গল্পে কথা শুরু করেছি, সেইদিকেই ফিরে আসি।
আমরা তখন যে পোস্টে চাকরি করি, তাতে ডাকাতি না করলে অমন লাখ লাখ টাকা রোজগার করা সম্ভব নয়। সে সুযোগ রয়েছে আমাদের ওপরের ধাপে, এবং তারও ওপরের স্তরে। ওপেন সিক্রেট, অভিজিৎ কাটমানির কারবার শুরু করেছে। শিলিগুড়িতে অনেকদিন থেকেই অনেককিছু সে জানে, এবার বসবাসের সুবিধে নিয়ে চিচিং ফাঁক হয়ে গেছে! বলতে চাইলাম, এই যে তোমাকে নিয়ে এত কথা হয়, আমার খারাপ লাগে। এইসব গপ্পো বেশি ছড়ালে তোমার ক্ষতিও তো হতে পারে! বয়েই গেল তাতে… এমনই শরীরী ভঙ্গি ওর। উল্টে শুনিয়ে দেয়, টাকা একরকম নেশা, বুঝলে?
আমার জিম্মায় ব্যাগ রেখে সেই যে স্নান করতে যাওয়া, সেটা আরও কয়েকবছর পরের প্রসঙ্গ। শিলিগুড়িবাসের প্রথম পর্যায়ে নেশার ঝোঁকে যা আহরণ করেছিল, সেইসব তখন ব্যাঙ্কে পোস্ট অফিসে ডিম পাড়তে পাড়তে বেশ পুষ্ট হয়েছে। সেসব সামলাতেই কলকাতায় মাঝে মাঝে আসা। যে যে হোটেল মেস বা আত্মীয়গৃহে ওঠে, আমারও সেখানে অবাধ যাতায়াত। ছোটদের কাগজটা আবারও ছাপিয়ে বার করা যায় কি না, এই আলোচনায় চমৎকার চলে যায় কিছু কিছু অপরাহ্ন…
মজা করেই একদিন বলি, এই যে তোমার এত সব কাণ্ডকারখানা, চেনাজানা অনেকেই খারাপভাবে এর সুযোগ নিতে পারে তো। ধরো, আমিই যদি ওই ব্যাগ থেকে একটা বান্ডিল ঝেপে দিতাম! নিদেনপক্ষে কয়েকটা নোট… ধরতে পারতে? সহসা উদাসীন হয়ে যাওয়া দৃষ্টিতে, আমার চোখের দিকে চেয়ে ও অল্প হেসে বলে, তুমি অমন করতেই পারবে না!
—এতোখানি কনফিডেন্স তোমার কোথা থেকে এল? টাকাকড়ি বড্ড খারাপ জিনিস, মুনিনাঞ্চ মতিভ্রম, সেই যে বলে না…
—যে যাই বলুক, তোমার মুখ দেখে প্রথমদিনেই যে বুঝেছি, তুমি একদম ইনভল্ভ্ড নও! কোনোকিছুতেই না, টাকাপয়সা তো তুচ্ছ ব্যাপার…
এইবার আমার বুকের ভেতরটা অন্যভাবে ধুকপুক করে ওঠে। যে ধনে হইয়া ধনী মণিরে মানো না মণি… আমার মতন সেও তো পড়েছে। তবে জীবনের ঘাত প্রতিঘাত সয়েছে অনেক বেশি। ওর জীবনের ওঠানামার সঙ্গে তুলনা টানলে, আমার যাপনটা যে নিতান্তই সাদাসিধে! তবু, ভয় হয়, পাশে চলতে চলতে বন্ধুতার খাতিরে যা যা বিপজ্জনক গল্প বলেছি, তারই থেকে ও কি অন্যরকম কিছু ধরে নিয়েছে?
আমার প্রথম উপার্জন চুরি করে নিয়েছিল মেয়েমানুষ চোর। প্রায় আমার মায়েরই বয়সি, দুই ছেলের মা। সেসব খারাপ কথায় মন আর ভারাক্রান্ত করতে ভালো লাগে না। দোষ তো আমারই, হোটেল মেসে থাকলে লেখাপড়ার ক্ষতি হবে, রান্নাবান্না পেটে সইবে না, এইসব কাল্পনিক আশঙ্কার তাড়ায় পেয়িং গেস্ট থাকতে গেলাম। গলদ আমারই; আহা, মাসিমা বলে ডাকি, যে সুটকেসে জামাকাপড় টাকাপয়সা সব থাকে, সেটা খুলেই রেখে যাই। খুচরো পয়সা রোজই কমে যাচ্ছিল। যেই একদিন টের পেলাম, বাবার দিয়ে যাওয়া, আড়ালে রাখা ঝকঝকে একশো টাকার নোটটা পাল্টে গিয়ে একটা ছেঁড়া নোট এসে পড়েছে, সেইদিনই কলিগদের সাহায্যে একটা মেসের চেষ্টা করি। রাত আটটায় ফিরে মাসিমাকে জানাই সে কথা। সেইসময়ে তাঁর ক্ল্যাসিক উক্তি, তোমাকে আমি বোকা ভেবেছিলাম, তুমি তো বোকা নও!
নিরীহ তাঁর স্বামীটি, এই চুরিচামারি জানতেন না নিশ্চয়ই। আচরণে আন্দাজ করি। তিনি ভাবতেন, আমার চিত্তের অস্থিরতা। এই নিয়ে পরে কয়েকটা গল্প লিখে উঠে মনে হয়েছে, বেশ প্রতিশোধ নেওয়া হল। কিন্তু অমন সহজ শোধবোধের হিসেবে কি সংসার চলে? আরও কিছু বিপজ্জনক গল্প যে লেখাই হয়নি, একে ওকে তাকে মুখে মুখে বলেছি শুধু। মাঝবয়েসে পৌঁছে, দিল্লি এবং কলকাতার নিভৃত সংসার যাপনে যখন কোনও ফারাক খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন একান্তে সন্ধ্যেবেলা মনে হয়েছে, শুধুই কি সাংসারিক নিরাপত্তাহীনতা? দু-চার দিনের সুখ খুঁজে নেবার চেষ্টায় যা হোক তা হোক করে মুঠোয় যেটুকু আঁটে, রজত মুদ্রায় তা ছিনিয়ে নেওয়া? চক্ষু মুদে বসে থাকা সম্ভব না যে। বাহিরের চলাফেরা যত কমে আসে, অন্তরের দৃষ্টি খুলে যায় ততোই…
পিসেমশাই মানুষটি নিরীহ, নির্বিরোধী; দূর সম্পর্কে বাবার মামাও যেন হন। বয়েসের বিচারে সে হতেই পারেন, তবে বেশ বন্ধুতা আছে দু’জনের। পুরনো দিল্লি স্টেশনে রিসিভ করতে গিয়েছিলেন আমাদের। কালকা মেল লেট ছিল। রাজধানীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় নাইট সার্ভিস বাসে যেতে যেতে। গোবিন্দপুরি ছাড়িয়ে অবিশ্বাস্য এক ধাপধাড়া গোবিন্দপুরে বাবার মামার আস্তানা, সেখানে এখনও ইলেক্ট্রিসিটি আসেনি। পিসতুতো ভাই সঙ্গেই ছিল, তাকে দেখে নিজেরই প্রায় সমবয়সি ভেবেছি; তার যে চার বছর আগে বিয়ে হয়েছে, বউদি এত রাতেও বসে আছে রান্নাবান্না সেরে, আমরা আসবো বলে, ব্যাপারটা বাবাকে ও আমাকেও অভিভূত করে রাখে।
আসল গল্পে চলে আসি। আত্মীয়গৃহে একটানা থেকে যাওয়া কখনও বাঞ্ছনীয় নয়, সব্বাই বলবে; আবার আপনজনেরাও ক্যাজুয়ালি বলবে, থাকো থাকো, এখানেই থেকে যাও, এও সত্যি। পেয়িং গেস্ট হিসেবে দিল্লির একদম ভিন্ন প্রান্তে আমাকে রেখে, বাবা তো দুদিন বাদেই ফিরে গেলেন কলকাতায়, আর আমার কাছে চমৎকার এক উইক এন্ড রিসোর্ট দিল্লির দক্ষিণতম প্রান্ত পেরিয়ে ওই ধূ-ধূ এলাকাটা। গাছের ডালে আয়না ঝুলিয়ে চুলদাড়ি কাটা হয়, দূর থেকে গম ভাঙানোর মেশিনের কুক কুক শব্দ পাওয়া যায়। জলের বেশ অসুবিধে। দরজা বন্ধ করার খিল, দুহাতে ধরে বউদি এবং উল্টোদিকের বাসার একজন দশাসই পাঞ্জাবি ভদ্রমহিলা, চারটি জলের বালতি সেই কাঠের ডাণ্ডায় ঝোলে। রাস্তার জলের কল থেকে ঘরে জল আনা হয় এইভাবে। বউদির চেহারাটি পলকা, কিন্তু গায়ের জোর যেন পাঞ্জাবিনীর চেয়ে বেশি। দু’জন দু’রকমভাবে হাসেন আমার দিকে। বউদির হাসিতে শাসন, একটা বালতির জলও কি কোনোদিন টেনেছ বাড়িতে? হাতদুটো দেখলেই বোঝা যায়…! ওদিকে পাঞ্জাবিনী, কেবলই হিহিহিহি, হোহো হোহো…
বউদির ব্যক্তিত্ব শুষ্কং কাষ্ঠং, তবে বিপরীত বাসার পাঞ্জাবিনীর কথা বলতে বলতে, মুখটা হাসিতে নরম হয়ে আসে। তোমাকে নিয়ে খুব কৌতূহল, জানো? মজা করে বলছিল, অন্দরমে সর্দারজি কিঁউ ঘুসায়া? তোমার দাড়ি আর গোল গোল চোখ দেখে… তার আগে নাকি ভেবেছিল, তুমি সত্যি সত্যি পুরুষ মানুষ কি না! তারপর পাঁচিলের পাশে দাঁড়িয়ে জল ফেরাতে দেখে সন্দেহটা কেটেছে…
এতখানিই দেখে ফেলেছে পাশের বাড়ির বউদি? জল ফেরানো মানে টয়লেটের ছোট কাজ। দিল্লি এসে শিখেছি। এখানে সবারই কথাবার্তা এমন সোজাসুজি, কাঠ কাঠ। পেইং গেস্ট থাকার সময়ে মাসিমাই শিখিয়েছেন, টয়লেটের কাজে মেয়েরা যায় স্নানের ঘরে, আর ছেলেরা ল্যাট্রিনে, এটাই এখানে প্রথা। আর যেখানে দুটোই এক দরজার আড়ালে? জিগ্যেস করতে ভরসা পাইনি। বউদি বরং আমার আড় ভাঙতে সাহায্য করেছে বেশ। পিসেমশাই কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সারাদিন কোথায় না কোথায় ঘোরেন জানি না, মুখে বলেন, কালকাজির দিকে যাচ্ছি, মেয়ের বাড়িতে। এই বাসার সঙ্গে শুধু খাওয়া আর রাত্তিরে ঘুমের সম্পর্ক। তাঁর পুত্রের তো তাও না; তিনটে বাস পাল্টে নাকি কাজের জায়গায় যেতে হয়। রাত্তিরে ফেরেও না অনেকদিন।… আমার তো তবু আস্ত একটা বর আছে, ওর যে থেকেও নেই! চোখ দিয়ে উল্টোদিকের বাসা দেখায় বউদি। তাই তো আমরা দু’জনে… তুমি চলে এসো আমাদের এখানে। আসবে? মজা হবে খুব…
মজা আসলে যা যা হতো, তা নিয়ে পাতার পর পাতা লিখে যেতে পারি। সব্বাই পড়ে খুব মজা পাবে, কেউ কেউ ভাববে, অশ্লীল। মূল বিষয় যে সেই ইনসিকিওরিটি, স্বভাব কতভাবেই না পাল্টে যায় তার জন্যে! আমিও কি আলাদা কিছু? এপ্রিল মে মাসে দিল্লির দুরন্ত গ্রীষ্মে খোলা ছাদ বা বাইরের গলিতে খাটিয়া পেতে শোওয়ার রেওয়াজ। আবালবৃদ্ধবনিতা, অনেকদিনের প্রথা। যেখানে সেখানে জল ফেরাতে দাঁড়িয়ে পড়বে না কিন্তু, আমাকে ডাকবে… শাসনের সুরে বউদির কথা। আসলে বউদিই আমাকে ডেকে তুলত। পারলে বাচ্চাদের করিয়ে দেবার মতন আমাকেও করিয়ে দেয় আর কি। ইস, কেমন টাটিয়ে উঠেছে ওটা! পাজামার বাইরে থেকেই তার দৃষ্টি অন্তর্ভেদী। আসল ঘটনাটা প্রথম কিন্তু ঘটেছিল ছোট ছাদে। পিসেমশাই সেদিন ভেতরের ঘরে, তাঁর পুত্র ফেরেনি। ঘুম ভাঙল, কে যেন আলতো করে আমার পাজামাটা কোমর থেকে টেনে অল্প নামিয়ে দিয়েছে। পোষা পাখিকে যেভাবে আদর করে, সেভাবেই যেন আমার ওই খেলনাটা… হ্যাঁ, খেলনাই তো বউদির কাছে, পরে কতবার যে বলেছে! মুখের মধ্যে পুরে চুষতে লাগলো, অসম্ভব তীব্র শিহরণ হচ্ছিলো আমার…
আর ঠিক তখনই, খুব শান্ত স্বরে বউদি বলে উঠলো, তোমার ব্যাগের ভেতর বইয়ের মলাটের মধ্যে যে নোটগুলো ছিল, সেগুলো খরচা করে ফেলেছি কিন্তু! সঙ্গে সঙ্গে উপচে ফেটে পড়লো শরীরটা। কী শুনলাম, ঠিক শুনলাম কি না, বুঝিয়ে দিতে আবার যেন কথাটা বলল, হাসির ভাব মুখে রেখে। তার মাথার খোলা চুল ঝামরে পড়েছে আমার বুকে। দুটো শরীরই খোলামেলা, কিন্তু খরচ করার স্বাধীনতা আর বুঝি নেই আমার। প্রচণ্ড ভিজে যাওয়া শরীরটা আর জাগল না তারপর।
তবু, ভাল তো লেগেছিল! পরের উইক এন্ড, অথবা তারপরে সহসা পাওয়া কোনও ছুটিতে ছুটে তো গিয়েছি জ্যান্ত মাছ কিনে! নিজে ভালো খাই না খাই, বউদি ভালোবাসে বলেই নিয়েছি। পিসেমশাইও খুশি। অনেক বছর আগে স্বর্গে চলে যাওয়া পিসির গল্প করেন তিনি মুড ভালো থাকলে। বউমার সঙ্গে আমার দুষ্টু দুষ্টু খেলাধুলো যে চান্স পেলেই হতে থাকে, তাঁর জানার কথা নয়। এদিকে বউদি আমাকে আরও সহজ করে তুলতে নানান মজার সব গপ্পো শোনায়। বর টর, মানে ছেলেরা নাকি আসলে কখনোই কিছু করতে পারে না। ওই পাঞ্জাবি প্রতিবেশিনীই নাকি তার আসল বন্ধু। আমি তো সপ্তাহে দুটো মাত্র দিন, তার সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই! চোখ গোল গোল করে অভাবিত এক সম্পর্কের কথা শুনছি দেখে বউদির বলার উৎসাহ বেড়ে যায়।… তোমাকে দেখেই নাকি ওর খুব ভালো লেগেছিল, জানো? ওই তো আমাকে তোমার সবকিছু বুঝেশুনে নিতে বলল… খুব ইচ্ছে ওর, হবে নাকি একদিন একসঙ্গে তিনজন? থ্রিসাম বলে ওটা… তবে আরও কিছু নোট সঙ্গে রেখো কিন্তু। ওর বর ও, আমারটারই মতন, তেমন কিছু রোজগার তো করে না…
অনেকদিন বাদে, অনেক দূরে, জীবনের ভিন্ন এক পর্বে পৌঁছে ভাবি, অভিজ্ঞতাগুলো সত্যি কি হয়েছিল? হয়েছিল তো বটেই, কারণ অভিজিৎ, এবং অভিজিতের মতন আরও অনেকের চোখেমুখেই যে ওই বিশ্বাস আর প্রত্যয় দেখি, তুমি অন্যরকম, তোমার কোথাও কোনও ইনভলভমেন্টও দেখি নেই!
মাথার মধ্যে ছমছম করে। বউদির সঙ্গে সাংস্কৃতিক কথাবার্তা বলা যেত না, নইলে নিশ্চয় বুঝিয়ে বলতাম, কলেজে পড়ার সময়ে আশেপাশে মেয়েরাও অনেকেই অমন বলতো যে! ক’টা প্রেম করেছি, কীভাবে, বানিয়ে বানিয়ে অত বলা যায়? যেন সবটাই ব্যাগভর্তি টাকা, যা আসলে কোনও কাজেই লাগবে না!