বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা নিয়ে রত্নার আর্জি খারিজ করে দিল কলকাতা হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে দ্রুত এই মামলার নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে আদালত। কলকাতার প্রাক্তন শোভন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায়ের মামলায় নিম্ন আদালতকে এই নির্দেশ রাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত।
প্রসঙ্গত বেশ কয়েকবছর ধরে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী শোভন চট্টোপাধ্যায় তাঁর বান্ধবী বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকছেন। ২০১৭ সালে বিবাহ বিচ্ছেদ চেয়ে মামলা করেছিলেন প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়। সেই থেকে তৃণমূলের বিধায়ক তথা স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে শোভনের বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা চলছে। কিন্তু এখনও তার নিষ্পত্তি হয়নি। কারণ নিম্ন আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তৃণমূল বিধায়ক রত্না চট্টোপাধ্যায়।
রত্নার দাবি, তাঁর তরফে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করা বাকি রয়েছে। তার আগেই নিম্ন আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করে দেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে শোভন নিজের পক্ষে সাক্ষী সাজাতে পর্যাপ্ত সময় পেয়েছেন। রত্নার তরফে এ পর্যন্ত মোট চার জন আদালতে সাক্ষী দিয়েছেন। দাবি, তাঁর আরও কয়েক জন সাক্ষী ছিলেন। এই মামলায় তাঁদের বয়ান গুরুত্বপূর্ণ। আলিপুর আদালতে এই সংক্রান্ত আবেদন জানিয়েছিলেন রত্না। সেখানে তাঁর আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। ফলে ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন বেহালা পূর্বের তৃণমূল বিধায়ক।
সম্প্রতি সেই মামলাটি হাইকোর্টে উঠলে আদালতে শোভনের হয়ে সওয়াল করেন দলেরই সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সওয়াল পর্বে তিনি রত্না চট্টোপাধ্যায়কে শোভনের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী বলে উল্লেখ করেন। তখন রত্নার বিরুদ্ধে শোভনের আইনজীবী কল্যাণকে ‘হুমকি’ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সংবাদমাধ্যমে তা নিয়ে তিনি মুখ খুলেছিলেন। প্রশ্ন তুলেছিলেন কল্যাণের ভূমিকা নিয়ে। রত্নার সেই বক্তব্যকে ‘হুমকি’ বলে উল্লেখ করে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার ফের মামলাটি ওঠে বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের বেঞ্চে। এদিন সেই মামলা খারিজ করে দিয়েছেন বিচারপতি। শুক্রবার শুনানির সময় আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরে নিম্ন আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। আর অযথা সময় নষ্ট করা যাবে না। দ্রুত এই মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে।
পাশাপাশি, এদিন শুনানির সময় রত্নার বক্তব্যকে ‘হুমকি’ বলে উল্লেখ করে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আদালতে শোভনের আইনজীবী জানান, রত্নাকে এর জবাব দিতে হবে। এরপরই রত্নার তরফের আইনজীবী বিষয়টি নিয়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন। কিন্তু তাতে ‘আন্তরিকতার অভাব’ ছিল বলে দাবি করেন শোভনের আইনজীবী। ফলে রত্নাকে দ্বিতীয় বার ক্ষমা চাইতে হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের শেষের দিকে বান্ধবী বৈশাখীকে জড়িয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর কলকাতার মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রতিবাদে সরব হন স্ত্রী রত্না। বিষয়টি সংবাদ মাধ্যম থেকে সামাজিক মাধ্যমে রীতিমতো শোরগোল পড়ে যায়। রাজ্যজুড়ে বাড়তে থাকে রাজনৈতিক বিতর্ক। এরপরই সাঁড়াশি চাপে পড়ে প্রথমে তিনি রাজ্যের অগ্নিনির্বাপণ, জরুরি পরিষেবা ও গৃহায়ন মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর কলকাতা পুরসভার মেয়রের পদও ছাড়তে বাধ্য হন মুখ্যমন্ত্রীর একসময়ের বিশ্বস্ত এই সঙ্গী।
শোভন তৃণমূল ছাড়লেও রাজনীতি ছেড়ে দেননি। তিনি রাজনৈতিক মঞ্চে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। সেজন্য বান্ধবী বৈশাখীকে নিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন। তবে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের সময় পদ্মশিবিরের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। তারপরে তাঁকে আর কোনও রাজনৈতিক মঞ্চে দেখা যায়নি। এদিকে রত্না বর্তমানে শোভনেরই ছেড়ে-যাওয়া বেহালা পূর্ব কেন্দ্রে তৃণমূলের বিধায়ক।
তবে এতসবের মধ্যেও রাজনৈতিক মহলের ধারনা, মমতার সঙ্গে শোভনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এখনও অটুট রয়েছে। একসময় প্রত্যেক ভাইফোঁটায় ‘দিদি’ মমতার হাতে শোভনের ভাইফোঁটাও বাঁধা ছিল। এর মধ্যে কয়েকবার শোভনের তৃণমূলে ফেরার জল্পনাও তৈরি হয়েছে। বিশেষত, মাঝে তিনি বৈশাখীকে নিয়ে নবান্নে গিয়ে মমতার সঙ্গে দেখা করতেই সেই জল্পনা আরও জোরদার হয়। যদিও শোভনের দলে ফেরা বাস্তবায়িত হয়নি।