কেন্দ্রের মোদী সরকার মুখে নারী-সম্মান বা নারী-সুরক্ষার কথা বললেও বাস্তবে সেটা যে হচ্ছে না, তা আরও একবার প্রমাণ হয়ে গেল। নারীদের আর্থিক সুরক্ষায় সবচেয়ে জনপ্রিয় সেভিংস সার্টিফিকেট স্কিমটি বন্ধ করে দিল কেন্দ্র। প্রকল্পটির বয়স মাত্র দুই বছর। আর দেশের মহিলারা এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। অতএব এই সেভিংস স্কিমটির মাধ্যমে দেশের মহিলারা একটা আর্থিক সুরক্ষার আলো দেখতে পেলেও অকালেই সেই প্রদীপ নিভে গেল। কার্যত দেশের নারী সমাজ রয়ে গেলেন সেই তিমিরেই।
প্রসঙ্গত ‘মহিলা সম্মান সেভিংস সার্টিফিকেট স্কিম, ২০২৩’ চালু হয় ২০২৩ সালের ১ এপ্রিল। এই প্রকল্পে সুদের হার অনেকটাই ভালো ছিল। ৭.৫ শতাংশ, যা অন্য অনেক ক্ষুদ্র সঞ্চয় বা ফিক্সড ডিপোজিট স্কিমের তুলনায়ও অনেকটা বেশি। মাত্র দুই বছরে ম্যাচিওরিটি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের এই প্রকল্পটি ১৮ বছরের বেশি বয়সি মহিলাদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের কথা মাথায় রেখেই চালু করা হয়। এই প্রকল্পটি নাবালিকাদের নামেও অভিভাবকরা চালু করেছেন। এই প্রকল্পে সর্বনিম্ন এক হাজার ও সর্বাধিক দুই লক্ষ টাকা জমা রাখার সুযোগ ছিল। একদিকে ৭.৫ শতাংশ হারে সুদ এবং সরকারি প্রকল্প হওয়ার কারণে খুবই অল্প দিনেই প্রকল্পটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আচমকা কেন্দ্রের তরফে বিজ্ঞপ্তি জারি করে প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়া হল। সেই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ৩১ মার্চ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এই স্কিমটি। ইতিমধ্যেই কোনও ব্যাঙ্ক বা ডাকঘরের শাখা যাতে আর নতুন করে ১ এপ্রিল থেকে এই প্রকল্পের অ্যাকাউন্ট না খোলে সেটার নির্দেশিকা জারি হয়েছে। ফলে এই প্রকল্পে নতুন করে আমানতও বন্ধ হয়ে গেল। কার্যত হতাশ দেশের সিংহভাগ মহিলারা, যাঁরা আর্থিকভাবে এখনও স্বচ্ছল নন।
বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে সোচ্চার হয়েছে তৃণমূল সহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। তাদের অভিযোগ, আসলে বিজেপি নারী বিদ্বেষী সরকার। তাদের শাসনকালে নারীরা মোটেও সুরক্ষিত নয়। তৃণমূলের এক মুখপাত্র কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে ভাঁওতাবাজির সরকার বলেও কটাক্ষ করেছেন। এ বিষয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথ অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিজেপির উচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া। দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে মমতা সরকারের বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প– লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথীর কথা। কেন্দ্রের সামগ্রিক বাজেটের মধ্যে নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রকের বাজেটে মাত্র ০.৫৩ শতাংশ বরাদ্দ। এর থেকেই স্পষ্ট, কেন্দ্রে কতটা ভাঁওতাবাজির সরকার চলছে।
এদিকে কেন্দ্র সরকারের এই তুঘলকি সিদ্ধান্তের পর একশ্রেণির মানুষের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একটি অংশে জল্পনা ছড়িয়েছে, হয়তো নারী সম্মানের নামে নতুন কোনও প্রকল্প বাজারে আসতে চলেছে। এব্যাপারে বিজেপি বাজারে নতুন একটি জল্পনা উস্কে দিচ্ছে বলে সূত্রের খবর। রাজনৈতিক মহলে ছড়ানো হচ্ছে, আরও বেশি লাভজনক কোনও স্কিম সরকারের মাথায় রয়েছে বলেই এই স্কিমটি তুলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটা কী? আদৌ এরকম কিছু আসছে কিনা তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের আর একটি অংশের নেতারা মনে করেন, কেন্দ্র সরকারের বেশিরভাগ প্রকল্পই টোপ। তবে এই প্রকল্পে সাড়া দিলেন না দেশের মহিলারা। যার ফলে বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় সরকার বন্ধ করে দিচ্ছে মহিলা সম্মান সেভিংস সার্টিফিকেট প্রকল্প। মাত্র দু’বছর আগে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এই প্রকল্পটি চালু করলেও তা সাফল্যের মুখ দেখেনি। কেন্দ্রের মন্ত্রীরা বারবার নারী সুরক্ষা ও নারীদের সম্মানের কথা বললেও মহিলাদের নিয়ে তেমন কোনও প্রকল্প সাড়া ফেলেনি দেশে।