অরুণাভ সেন
গান মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম। হাসি কান্নায় মানুষের কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হয়। তাই বোঝা যায় নানা ভাবের নানা সুর আছে, সেই সুরের চর্চা করে গানের উৎপত্তি।
যদি বলা হয় বাঙালি কন্যাদের জন্য তিনি গানের দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন তাহলে একদম ভুল বলা হয় না। যখন চন্দ্রমুখী, কাদম্বিনীকে দেখার জন্য রাস্তায় মানুষের চোখে শ্রদ্ধামিশ্রিত সম্মান ও ভিড় তখন প্রতিভাদের নাম যুক্ত হলে হয়ত ভাল হত! কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরীক্ষা, সাফল্যের ক্ষেত্রে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও শিল্প – সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তারা এগিয়ে গেলেন অনেক কদম। অনেক কিছু হয়ত ইতিহাসের চোখে বাসি! কিন্তু তাদের জীবনের গল্প ফুলের মত তাজা। জীবনের প্রতিটি দিন কাজে ডুবে না থাকলে সম্ভব নয় এতখানি সোনার রঙের সাফল্য। দেশে তখনও জ্ঞান – বিজ্ঞান হোক অথবা সংগীত মেয়েদের জন্য কোথাও অদৃশ্য একটা পর্দা। সমাজ তখনও খুব উদার একথা আমরা বলতে পারি না। যাই হোক না কেন ছোটবেলাকে কিভাবে ভোলা যায়! শৈশবস্মৃতি জীবনের একটা ঐশ্বর্য। আপন জীবনচরিত লিখতে গিয়ে অনেক মনীষার কলমে ফুটে উঠেছে শৈশবের সেই নানা রঙের দিনগুলি, যা পুরনো হয়েও চিরকালের নতুন। আমাদের কাহিনী দুই বোনের যারা বাঙালির জীবনে গান ও রান্নাঘরে কার্যত বিপ্লব করেছেন। মহর্ষির আধ্যাত্মসাধনা ও হেমেন্দ্রের ধর্মানুরাগ সঞ্চালিত হয়েছিল প্রতিভার জীবনে। তিনি সাহিত্য চর্চা করেছেন একথা সঠিক ভাবে না বলা গেলেও প্রতিভা ইংরেজি, ফরাসি, ল্যাটিন, সংস্কৃত ভাষা শিখেছিলেন তেমন যথেষ্ট উৎসাহী ছিলেন ইতিহাস, ভূগোল সহ অন্যান্য বিদ্যা চর্চায়। সংগীতের ক্ষেত্রে প্রতিভার সত্যিকারের অবদান হল স্বরলিপি রচনার সহজতম পন্থাবিষ্কার। ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’ ও ‘কালমৃগয়া’, গানগুলির প্রথম স্বরলিপিকারের নাম প্রতিভা। রবীন্দ্রনাথের সুহৃদ আশুতোষ চৌধুরীকে স্বামী হিসেবে পাওয়ায় বিয়ের পরেও সৌভাগ্যক্রমে তাঁকে কোনও বাধা পেতে হয়নি। প্রতিভা বা প্রতিভাসুন্দরী রবীন্দ্রনাথের চেয়ে মাত্র পাঁচ বছর কম বয়স। মহর্ষির তৃতীয় পুত্র হেমেন্দ্রনাথের প্রথম সন্তান সত্যিকারের প্রতিভাময়ী। অথচ তাঁর স্বামী আশুতোষ বিলেত যাওয়ার প্রবল সামাজিক প্রতিকূলতার সামনে পড়েছিলেন তাঁর বাল্যবিধবা পিসিরা। যদিও শেষ পর্যন্ত বিচারপতি আশুতোষ চৌধুরী জায়া প্রতিভা হয়ে উঠলেন লেডী চোধুরী, অনুপ্রেরণার আরেক নাম।
পাবনার বিখ্যাত চৌধুরী পরিবার। সেই পরিবার যে সমসাময়িক সময়ে খুব উদার এমন বোধহয় বলা যাবে না! কিন্তু ওই পরিবারের সন্তান আশুতোষ যা করেছিলেন তার নজির কোথায় ! আশুতোষদের সাত ভাই বিবিধ গুণের অধিকারী। বিশেষ করে আশুতোষ ও প্রমথ। শিক্ষায় আশুতোষের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক বছরে বিএ ও এমএ পাস করেছেন (১৮৮১)। আশুতোষ বিলেত যাচ্ছিলেন কাঠখড় পুড়িয়ে। তাঁর দিদি প্রসন্নময়ী পূর্বকথা’য় লিখেছেন আশুতোষের পথ খুব সুগম ছিল না। চৌধুরী বংশে আশুতোষ প্রথম বিলেতে যান। এর আগে ওই জেলায় কেউ বিলেত যাননি। ফলে যা হওয়ার তাই হল। গেল গেল রব উঠল। চৌধুরীরা প্রায়শ্চিত্ত করে সমাজে ওঠার চেষ্টা করলেন না। সমাজপতিদের আক্রমণ ধেয়ে এল আশুতোষের বিধবা পিসিদের দিকে। শেষ পর্যন্ত তাদের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়।
প্রত্যেককে পাঁচ কাহন কড়ি দিয়ে মাথা মুড়িয়ে তবে অব্যহতি মিলল। প্রসন্নময়ী লিখেছেন ” তাঁহারা বাল্যবিধবা, আশৈশব ব্রহ্মচর্য প্রতিপালন করিয়া চলিতেন”। তবুও তাদের নিয়ে টানাটানি পড়ে। আসলে এটা তখন সমাজের ছবি। কেউ বিলেত গেলে গোটা পরিবার নিয়ে টানাটানি হত। অথচ খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। ১৮৮১ সাল, ততদিনে জ্ঞানদানন্দিনী দুটো শিশু নিয়ে বিলেত ঘুরে এসেছেন। চন্দ্রমুখী এন্ট্রান্স পাস করেছেন কাদম্বিনীর সাথে স্নাতক হবার তোড়জোড় চলছে। রবীন্দ্রনাথ ও আশুতোষের সখ্য কখনও ক্ষুন্ন হয় নি। তিনি বিলেত থেকে ফিরে ঠাকুরবাড়ির সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান। তাঁর সরল ব্যবহার ও স্বভাব সবার ভাল লাগল। আলাপ হল প্রতিভার সঙ্গে। রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী প্রতিভার সাথে আশুতোষের ভাল মানাবে। বিয়ে হল দুজনের। খুশি হলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। বলেছিলেন আশু আমার একটা অর্জন। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে আশুতোষের বাকি ভাইদের সাথে কি প্রতিভার ছয় বোনের বিয়ে হবে। তবে হ্যাঁ চৌধুরী বাড়ির তিন ভাইয়ের সাথে ঠাকুরবাড়ির তিন কন্যার বিয়ে হয়। কিন্তু কেউ প্রতিভার নিজের বোন নন।
প্রতিভা দ্বিজেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্বরলিপি পদ্ধতি ও স্বরসন্ধি প্রয়োগ পদ্ধতিতে যেমন নতুনত্ব এনেছেন তেমন করে তুলেছিলেন সবার ব্যবহারের উপযোগী। প্রতিভার আগে কোন মহিলা স্বরলিপি নির্মাণের বিষয়ে এগিয়ে আসেননি। শুধু স্বরলিপি নির্মাণ করলে হবে না গাইবে কে? প্রতিভা প্রকাশ্যে গান গেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করলেন। তাকে নিত্য নতুন রসসিঞ্চন করে বাঁচতে হবে। সেই ভার নিজে নিলেন। স্বরলিপি নির্মাণের সঙ্গে চলল গান শেখাবার চেষ্টা। তারও হাতেখড়ি ‘ বালকে’। সেখানেই তিনি কাগজে কলমে খুললেন গানের ক্লাশ ‘ সহজ গান শিক্ষা’। ‘বালক’ ছোটদের দিয়ে শুরু। তাই তিনি সবাইকে বললেন গান কাকে বলে। সেই বয়সে প্রতিভা বললেন গান মানুষের স্বাভাবিক। হাসি কান্নায় মানুষের কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হয়। তাই বোঝা যায় নানা ভাবের নানা সুর আছে। সেই সুরের চর্চা করে গানের উৎপত্তি। গান এমন জিনিস যার চর্চা প্রয়োজন অতএব নিজের বাড়িতে প্রতিভা খুললেন ‘ আনন্দসভা’ পরে ‘ সঙ্গীত সংঘ’। তিনি শেখাতেন খাঁটি ওস্তাদি গান। খুব ভাল জানতেন বিদেশি সংগীত। মহর্ষি তাঁকে একটি পিয়ানো কিনে দিয়েছিলেন। প্রতিভা তখন লেডি চোধুরী হিসেবে পরিচিত। বিচারপতি স্যার আশুতোষের স্ত্রীর স্কুলে উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েরাও গান শিখতে আসেন। প্রতিভার দেখাদেখি ইন্দিরা চৌধুরী ও এগিয়ে এসেছিলেন। ঘটনা সুত্রে তিনিও এসেছেন চৌধুরী বাড়ির বউ হয়ে।
বাঙালি কোনওদিন সেই অর্থে হয়ত ভোজনবীর নয় তবে অবশ্যই ভোজনরসিক। বাঙালি নারীরা রান্নাঘরকে করেছেন শিল্পের মন্দির। এখনও কত তরকারি, পিঠে পায়েস অতিথির থালার পাশে সাজিয়ে দেওয়া হয় সেখানে যেন ছত্রে ছত্রে সুগৃহিনীদের দক্ষতা প্রতিফলিত হয়। কিন্তু – কতজন জানেন আদার রসে হিং ভিজিয়ে রেখে হিংগোলা নিরামিষ তরকারিতে দিলে পেঁয়াজের গন্ধ হয় কিংবা ডাল -তরকারি হাঁড়িতে লেগে গেলে তাতে কয়েকটা আস্ত পান ফেলে দিলে পোড়া গন্ধ কমে যায়?
প্রতিভার মেজো বোন প্রজ্ঞাসুন্দরীর মন টেনেছিল রান্নাঘরে। সেই কাহিনী সবার জানা। আর একবার শুনলে অসুবিধা কিছু নেই। তবে এই সব দাম শুনে মনখারাপ করবেন না কিন্তু। পাকা রুই তিন বা চার আনা, চিতল মাছ তিন পোয়া ছয় আনা, বড় বড় ডিমওয়ালা কই আট-ন’টার দাম নয় দশ আনা, একটি ডিম একটা পয়সা, ঘি এক সের এক টাকা, দই এক সের চার আনা, টমেটো কুড়িটা দুই আনা। এই দামগুলো দরদাম করলে জিনিসপত্রের হয়তো আরও একটু কমত। দামগুলো সঠিক বাজারদর কিনা তিনি যাচাইও করতেন, ‘পূণ্য’ পত্রিকায় শুধু হরেক রকম আমিষ নিরামিষ ব্যঞ্জনের পাক প্রণালী ছাপা হত না বাজারদর জানিয়ে পাঠকদের সচেতন করার কাজটা দক্ষতার সঙ্গে করতেন পত্রিকা যিনি সম্পাদনা করতেন সেই প্রজ্ঞাসুন্দরী। তিনি সেই নারী যিনি অনেক রান্নার আবিস্কার নিজে করেছেন। যেমন রামমোহন দোল্মা পোলাও’, ‘দ্বারকানাথ ফির্নিপোলাও’, ‘সুরভি পায়েস’। রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশতম জন্মদিনে ফুলকপি,খোয়া ক্ষীর বাদাম, কিশমিশ, জাফরানপাতা’ সোনা রুপোর তবক দিয়ে ররফি তৈরি করে তার নাম দিয়েছিলেন ‘কবি সম্বর্ধনা’ বরফি। মজার বিষয় খেয়ে কেউ বুঝতে পারলেন না এটা আসলে ফুলকপির তৈরি।
বাংলায় রন্ধন শিল্পকে যিনি লোকশিল্পের মর্যাদা দেওয়া হয় সবার আগে নাম করতে হবে প্রজ্ঞাসুন্দরীর। প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী-র জন্ম ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে (আনুমানিক)। ঠাকুরপরিবারে জন্ম। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয় পুত্র হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বিতীয়া কন্যা। হেমেন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন, লেখাপড়া গানবাজনা শিক্ষার পাশাপাশি রান্নাবান্নাতেও সুপটু হয়ে উঠুক সন্তানরা। এই উদ্দেশ্যে বাড়িতে সুদক্ষ পাচক নিযুক্ত করে রীতিমতো শিক্ষাদানেরও ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি।
প্রজ্ঞাসুন্দরীর জীবনের স্মরণীয়তম কীর্তি ছয় খণ্ডে রচিত ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’। আজ থেকে প্রায় এক শো বছর আগে যখন এ-বই লেখার পরিকল্পনা করেন তিনি, বাংলা ভাষায় তখন রন্ধনবিদ্যাশিক্ষার বই একেবারেই সুদুর্লভ। এ-বিষয়ে তিনিই অগ্রগণ্যা। বহু পলিতকেশ গৃহিণীর কাছে শোনা যায় যে, বিবাহপরবর্তী জীবনে তাঁদের অনন্য অবলম্বন ছিল উপহার বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই বইয়েরই একেকটি খণ্ড-যার সহায়তায় অতি সহজে ও তুমুল সাফল্যের সঙ্গে তাঁরা নতুন সংসারে গিয়ে হেঁশেলের হাল ধরেছেন। বাস্তবিক প্রজ্ঞাসুন্দরী রান্না ও রান্নাঘর নিয়ে কেতাবি ভাষায় রন্ধনতত্ত্ব ও রন্ধনবিদ্যা নিয়ে যত মাথা ঘামিয়েছেন আর কেউ ঘামাননি। ঠাকুর বাড়ির সব মেয়ে বউ অল্পবিস্তর রাঁধতে পারতেন। তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছেন কাদম্বরী ও মৃণালিনী। সৌদামিনীদের প্রতিদিন একটা করে তরকারি রান্না শিখতে হত। তাহলে প্রজ্ঞার নতুনত্ব কোথায়। বলতে গেলে তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে রান্না শিখেছেন। প্রজ্ঞার মা ভাল রান্না করতেন। অবশ্য রোজকার ব্যঞ্জন ডাল, মাছের ঝোল,অম্বল। তরকারিতে বেশ মিষ্টি দেওয়া হত।
প্রতিভা যখন সংগীত নিয়ে ভাবছেন তখন তাঁর মেজো বোন প্রজ্ঞাসুন্দরী ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন চির পুরনো,চির নতুন জিনিস নিয়ে। দিদির মত গান শেখা, স্কুলে যাওয়া দিয়ে শুরু করেও তাঁর জীবনের গতি অন্যদিকে প্রবাহিত হল। প্রজ্ঞার মন টেনেছিল রান্নাঘরে। অসমিয়া সাহিত্যের জনক লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া প্রজ্ঞার স্বামী। বিয়ের আগে তাদের কখনও সাক্ষাৎ হয়নি। তবে লক্ষ্মীনাথ লিখেছেন ঠাকুরবাড়ির গুণবতী কন্যাকে দেখে তিনি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন এবং বিবাহে সম্মতি দেন। যদিও তাঁর বাড়ি থেকে অনেক বাধা আসে। যদিও সব বাধা- বিপত্তি অতিক্রম করে ১৮৯১ সালের ১১ মার্চ স্বপ্ন রঙিন সন্ধ্যায় সপ্তপদী গমনের পর শুভদৃষ্টি। লক্ষ্মীনাথ দেখলেন প্রজ্ঞা তাঁর দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেললেন। হাসি ফুটলো ল়ক্ষ্মীনাথের ঠোঁটের কোণে। তিনি প্রজ্ঞার কাছে জানতে চাইলেন “শুভদৃষ্টির সময় ওইরকমভাবে হেসেছিলে কেন? প্রজ্ঞার উত্তর” বিয়ের অনেকদিন আগেই তোমাকে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম”। স্বপ্নে দেখা সেই মুখের সঙ্গে ল়ক্ষ্মীনাথের মুখের হুবহু মিল। তাদের দাম্পত্য জীবন খুবই সুখের। প্রজ্ঞা জানতেন দাম্পত্য জীবনকে সুখের আগার করে তুলতে হলে গৃহিনীকে কোন দিকে নজর দিতে হবে। তাঁকে মায়ার খেলায় দেখা গেছে,ছবি আঁকতে দেখা গেছে। তবে সবকিছু ছেড়ে তিনি আঁকড়ে ধরলেন রান্নাঘর। প্রজ্ঞা আরও একটি নতুন জিনিস বাংলার ভোজসভায় এনেছিলেন। সেটি হল বাংলা মেনু কার্ড বা তাঁর নিজের ভাষায় ‘ক্রমণী’। বিলিতি ধরনের রাজকীয় ভোজে মেনু কার্ডের ব্যবস্থা আছে। প্রজ্ঞা স্থির করলেন তিনিও নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদের জন্যে ক্রমণীর ব্যবস্থা করবেন। ছাপা ক্রমণী যদি হাতে হাতে বিলি করা না যায়, তা হলে সুন্দর করে লিখে খাওয়ার ঘরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিলেও চলবে। শুধু নামকরণ করেই প্রজ্ঞা কর্তব্য শেষ করেননি। বাংলা ক্রমণী কেমন হবে, এক-একবারের ভোজে কী কী পদ থাকবে, কোন পদের পরে কোনটা আসবে, কিংবা কেমন করে লিখলে শিল্পসম্মত হয়ে উঠবে সেকথাও ভেবেছেন। কয়েকটা ক্রমণী দেখলেই বোঝা যাবে ব্যাপারটা। ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’- শুধু রান্নার বই হিসেবেই পথিকৃৎ তা নয়, এই বইয়ের নানান খণ্ডে প্রজ্ঞাপ্লুত যেসব ভূমিকা লিখে গিয়েছেন তিনি, সেগুলিও-আজ এতকাল পরেও-গার্হস্থ্যবিজ্ঞানের আবশ্যিক প্রথম পাঠ হিসেবেই মর্যাদা পাবার যোগ্য। বস্তুত, রান্নার বইয়ের শেষ কথা প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর এই মহাগ্রন্থ। ছ-খণ্ডে প্রকাশিত এই মহাগ্রন্থে যেসব রান্না মুদ্রিত হয়েছিল, তার বাইরেও বেশ কিছু রন্ধনপ্রণালীর পাণ্ডুলিপি লেখিকার মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রজ্ঞা ভেবেছিলেন পাকপ্রণালীর পরে লিখবেন গৃহবিজ্ঞানের বই। কিন্তু সে আর হয়ে ওঠেনি। এর ফলে অপূরণীয় ক্ষতি রয়ে গেল গৃহবিজ্ঞানের। প্রজ্ঞার মতো এত যত্নে রান্নার বই লেখার কথা গার্হস্থ্যবিজ্ঞানের শিক্ষিকারাও ভাবেন বলে মনে হয় না। তিনি বইয়ের প্রথমদিকে খাদ্য, পথ্য, ওজন, মাপ, দাসদাসীর ব্যবহার, পরিচ্ছন্নতা সব ব্যাপারেই প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন। সেইসঙ্গে তৈরি করেছেন রান্নাঘরে ব্যবহৃত শব্দের পরিভাষা। হয়ত শব্দগুলো আমাদের অজানা নয়, তবু এ ধরনের শব্দের সংকলন এবং পরিভাষা থাকা প্রয়োজনীয় তাতে সন্দেহ নেই। কতখানি উৎসাহ এবং নিষ্ঠা থাকলে একাজ করা সম্ভব, পরিভাষার দীর্ঘ তালিকা দেখলেই বোঝা যাবে। প্রজ্ঞা চলিত এবং অপ্রচলিত কোনও শব্দকেই অবহেলা করেননি। পড়তে মজা লাগে যখন কচি লেবু হয় ‘কড়াই লেবু’ কিন্তু কচি আম হয় ‘কড়ুই আম’। ‘দাগ দেওয়া’ শব্দটির অর্থ রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়ায় ‘ঘিয়ে গরম মশলা ছাড়িয়া পাক করা।’ রয়েছে আরও কত চেনা-অচেনা শব্দ।
প্রজ্ঞার রান্নার দুটো বই আমাদের মনে যে কৌতুহল জাগিয়ে তোলে সেটা হল ভাইঝির এই রন্ধননৈপুন্যে রবীন্দ্রনাথ কত খুশি হয়েছিলেন। ‘কবি সম্বর্ধনা’ বরফি দেখে নিশ্চিত তিনি খুশি হয়েছিলেন। কবি কখনও প্রজ্ঞার রান্নার গল্প করেননি, যদিও তাঁর গ্রন্থাগারে প্রজ্ঞাসুন্দরীর ‘আমিষ ও নিরামিষ আহার’ বইগুলি ছিল। মাধুরীলতা এই বই বাবার কাছে চেয়ে পাঠালে তিনি সুবোধচন্দ্র মজুমদারকে লেখেন, ‘বেলা প্রজ্ঞার আমিষ আহারের (দ্বিতীয় খণ্ড) চেয়ে পাঠিয়েছে। সেটা আমাদের লাইব্রেরিতে আছে। খোঁজ করে নিশ্চয় তাকে পাঠিয়ে দিও।’ প্রজ্ঞার ‘ক্রমণী’ আবিষ্কারে কাকার উৎসাহ ছিল কিনা তাও জানা গেল না। রুটিতোষ শব্দটি তিনি ব্যবহার করতেন। সেঁকা পাঁউরুটিকে তিনিই এ নামটি দিয়েছিলেন, না, প্রজ্ঞার নামটিকে সস্নেহে ব্যবহার করেছেন, সে কৌতূহলও রয়ে গেল। পরিশেষে নিজের ভাগ্যকে জয় করার অধিকার নারীর তখনও ছিল না! কারণ সমাজ তাদের সেই অধিকার দেয়নি। কিন্তু ইতিহাস আমাদের জানিয়ে দেয় অন্ধকার থেকে আলোতে উত্তরণের কাহিনী। অবশ্যই সেই নারীর সেই অর্জন সহজ হয়নি। বাংলাদেশে প্রেম নায়ক পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন বঙ্কিমচন্দ্র, কর্তাদের বারণ কেউ মানল না। তারপর এলেন রবিবাবু। তিনি আমাদের সকলকে প্রেমে পড়তে শিখিয়েছেন শুধু নয় রবীন্দ্রনাথের নারী হলেন স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব। বঙ্কিমচন্দ্র যেন বলতে চেয়েছিলেন নারীদের এই ভাবে গড়ো, রবীন্দ্রনাথ নারীদেরকে এগিয়ে দিলেন সমাজকে নতুন করে গড়তে। বঙ্কিমের জ্যোৎস্নাময়ীরা জ্যোর্তিময়ী হয়ে উঠল রবীন্দ্রনাথে। আপন ভাগ্যকে জয় করার অধিকার তারা অর্জন করলেন নিজেদের রূপের জোরে নয় নিজেদের প্রতিভায়, নিজেদের গুণে। হয়ত ঘটনাচক্রে রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি প্রজ্ঞাসুন্দরী ও প্রতিভা। কিন্তু তারাও সমাজের কাছে অনুপ্রেরণা হয়েছেন নিজেদের প্রতিভায় নিজেদের সৃজনশীলতায় নিজেদের গুণে। যতদিন বাঙালির ঘরে রান্না হবে, গান হবে ততদিন রবীন্দ্রনাথের দুই ভ্রাতুষ্পুত্রীর নাম উচ্চারিত হবে।
পুস্তক ঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার, ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
1) প্রজ্ঞাসুন্দরী, প্রথম ছবি
2) প্রতিভা, দ্বিতীয় ছবি