• facebook
  • twitter
Friday, 4 April, 2025

মহাকুম্ভও ডোবাল যোগীকে

মৌনী অমাবস্যার রাতে পুণ্য লগ্নে স্নান করার জন্য যে ব্যাপক হুড়োহুড়ি শুরু হয় তাতে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারত।

নিজস্ব চিত্র

এবারের কুম্ভমেলা ঘটনাবহুল। দুই দশকের বেশি সময় পর এই মেলাকে কেন্দ্র করে নানা কথা, নানা সমালোচনা, নানা অবাঞ্ছিত ঘটনা এবং সর্বোপরি গঙ্গা ও যমুনার মিলন সঙ্গমে পুণ্য অর্জনার্থে ৩০ জন পুণ্যার্থীর পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু এবং আহত শতাধিক।— এই মেলা তাই ইতিহাস হয়ে থাকবে। পদপৃষ্ট হয়ে অকাল প্রয়াণ এখানে শেষ নয়— দিল্লি স্টেশনে প্রয়াগরাজে যাওয়ার জন্য ট্রেনে ওঠার সময় ব্যাপক হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয়ে ১৮ জনের মৃত্যুও একটি মর্মস্পর্শী ঘটনা। নেতারা পুন্যস্নান করতে এলে সেখানে পুণ্যার্থীরা জমায়েত হয়েছিলেন। সেখানে বিভিন্ন দিনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা-যার জন্য পুড়ে যায় বেশ কয়েকটি তাঁবু।

মৌনী অমাবস্যার রাতে পুণ্য লগ্নে স্নান করার জন্য যে ব্যাপক হুড়োহুড়ি শুরু হয় তাতে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারত—কিন্তু তা ঘটেনি, সেটাই শুধু বাঁচোয়া। এবারের এই মহাকুম্ভ মেলার আয়োজন করেছিল উত্তর প্রদেশের বিজেপির শাসনাধীন সরকার যার নেতৃত্বে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্য নাথ। পুণ্যার্থীর এই মৃত্যু এবং মেলা প্রাঙ্গণে নানা অব্যবস্থার জন্য যোগীবরকে সমালোচনায় বিদ্ধ করেন বিরোধী দলের নেতারা এবং দেশের সাধারণ মানুষ। কিন্তু যোগীবর তাদের কথার কোনো মূল্য না দিয়ে বলেন ব্যবস্থার কোনও ত্রুটি ছিল না। যেখানে প্রায় ১০ কোটি পুণ্যার্থী জমায়েত হয়েছিলেন সঙ্গমে অবগাহন করে পুন্য অর্জন করার জন্য সেখানে ৩০ জন পুণ্যার্থীর মৃত্যু নিছকই একটি দুর্ঘটনা ছাড়া কিছু নয়। তার দাবি প্রশাসন এই মহাকুম্ভ মেলা সুষ্ঠুভাবে হওয়ার জন্য যথোচিত ব্যবস্থা করেছিল— তবুও এই দুর্ঘটনা এড়ানো গেল না। যা দুঃখজনক এবং মর্মস্পর্শী।

সমালোচকেরা বলেন মৌনী অমাবস্যার রাতে পুণ্য লগ্নে স্নান করে পুণ্যলাভ করার জন্য পুণ্যার্থীরা যে ঠেলাঠেলি শুরু করেন, তা যোগী প্রশাসনের আগেই ভাবা উচিত ছিল এবং সেইভাবে ব্যবস্থাদি অবলম্বন করা যেত, যাতে এই হুড়োহুড়ি এড়ানো যায়। কিন্তু প্রশাসনের কর্তাদের মাথায় তা আসেনি। এলে এতগুলি জীবন হয়তো বাঁচানো যেত। অনেকের কাছেই এটা দুঃখের, এই মহাকুম্ভ মেলায় পদপিষ্ট হয়ে পুণ্যার্থীদের মর্মান্তিক মৃত্যুর পরও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি। তিনি শুধু টেলিফোনে যোগী আদিত্যনাথের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা সেরেছেন। তারপর সবকিছু থিতিয়ে গেলে, মেলা প্রাঙ্গণ শান্ত হলে প্রধানমন্ত্রী প্রয়াগরাজে এসে সঙ্গমে স্নান করেন। তাঁর এই স্নানের জন্য আলাদা স্থান নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। যাতে স্নান কার্যে প্রধানমন্ত্রীর কোনও অসুবিধা না হয়।

দেশের নেতারা কুম্ভমেলায় পুণ্যার্থীদের মৃত্যু এবং পর্যাপ্ত ব্যবস্থাদি না নেওয়ার জন্য যোগী আদিত্যনাথের সমালোচনা করে বলেন সেখানে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীদের সমাবেশ হবে, সেখানে প্রশাসন আরও তৎপর হয়ে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে পারত। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কুম্ভ মেলার পুণ্যার্থীদের মৃত্যুর জন্য দুঃখ ও সমাবেদনা প্রকাশ করে বলেন, ‘তিনি কুম্ভ মেলাকে সম্মান করেন। বলেন কুম্ভের কথা নাই বা বললাম। মহাকুম্ভ না মৃত্যুকুম্ভ? মৃত্যুকূপ হয়ে গিয়েছে।’ বিধানসভায় ভাষণে বিজেপির সমালোচনা করে তিনি কুম্ভের প্রসঙ্গ তোলেন। বিজেপির বিধায়করা মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন।

প্রয়াগরাজে যাওয়ার জন্য দিল্লি স্টেশনে পুণ্যার্থীদের ট্রেনে ওঠার কালে যে হুড়োহুড়ি লেগে যায়, তাতে পদপিষ্ট হয়ে ১৮ জনের মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনাও মর্মান্তিক। অভিযোগ দিল্লি স্টেশনে প্রয়াগরাজে বেশি সংখ্যায় মানুষ জমা হলেও, রেলের তরফে যাত্রীদের মধ্যে শৃঙ্খলা রক্ষার কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ছিল না পর্যাপ্ত সংখ্যায় রেল পুলিশও। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয়, রেল কর্তৃপক্ষ প্রথমে বিষয়টি গুজব বলে উড়িয়ে দেন। পরে অবশ্য তাদের ঘুম ভাঙে এবং ঘটনার কথা স্বীকার করে। কিন্তু এত বড় দুর্ঘটনা ঘটলেও, রেলমন্ত্রীকে ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি। বিরোধীরা রেলমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তিনি কি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাকে চেপে যেতে চেয়েছিলেন? ঘটনা ঘটার পর রেলের বড় কর্তাদের উপস্থিতি দেখা যায়।

গত লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির ফল আশানুরূপ না হওয়ার জন্য বিজেপি কেন্দ্রে এককভাবে দিল্লির মসনদ ধরে রাখতে পারেনি। বিজেপিকে নির্ভর করতে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ও অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর দলের ওপর। তাঁদের সাহায্যে বিজেপি তৃতীয় বারের জন্য সরকার গঠন করে। উত্তরপ্রদেশে দলের খারাপ ফল হওয়ার জন্য বিজেপি নেতাদের একাংশ দায়ী করেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ব্যর্থতাকে। এই ব্যর্থতা ঢাকতে তিনি ভেবেছিলেন এবারের কুম্ভমেলা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে, তিনি বিজেপির শীর্ষকর্তাদের বাহবা পাবেন এবং লোকসভায় খারাপ ফলের গ্লানি মুছে যাবে। কিন্তু কুম্ভমেলায় পুণ্যার্থীদের মৃত্যুর জন্য তিনি আবার দলে সমালোচিত হলেন। যদিও যোগীবর সবসময়ই প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সমর্থন পেয়ে আসছেন। তাঁদের কথায় কুম্ভমেলায় তেমন কোনও অব্যবস্থা হয়নি। পুণ্যার্থীদের মৃত্যু নিছকই একটি দুর্ঘটনা বলে যোগীবরের পাশেই তাঁরা থাকছেন।

প্রশ্ন উঠছে সঙ্গমে দলের দূষণ নিয়েও। যে জলে লক্ষ লক্ষ পূণ্যার্থীরা স্থান করলেন তা দূষিত এবং পুণ্যার্থীদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। কিন্তু যোগী আদিত্যনাথ এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, সঙ্গমের জল দূষণ মুক্ত। উত্তরপ্রদেশ সরকারের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ গঙ্গা ও যমুনার জল পরীক্ষা করে দেখেছে তা দূষিত নয়। কিন্তু কেন্দ্রের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ সঙ্গমের জল ভয়াবহ দুষিত বলে রায় দিয়েছে। এই জলে পুণ্যার্থীরা স্নান করলে তাঁদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তবে পুণ্যার্থীরা এই জলে স্নান করেই পুণ্য অর্জন করলেন, সেটাই বড় কথা। নানা দিক থেকেই এবারের মহাকুম্ভমেলা ঘটনাবহুল হয়ে রইল।