ভারতের অতীত সহনশীলতার কথাই বলেছে। দেশের নানা অংশে নতুন করে আওরঙ্গজেবকে নিয়ে বিতর্ক বাঁধানোর যে চেষ্টা হচ্ছে, তারই প্রেক্ষিতে বলা যায়, সাম্প্রদায়িকতা দেশপ্রেম নয়, তা সে যে ধর্মেরই হোক। ঠিক ভুল না বুঝে শুধু নিজের দেশের সুখ্যাতি করে যওয়াটাই দেশপ্রেম নয়। আমার দেশের জন্য আরও ভালো কিছু করতে হবে, এটাই দেশপ্রেম। দেশপ্রেমের প্রথম শর্তই তো হলো, দেশের মানুষের সেবা করা। দেশের মানুষের একাংশকে পৃথক করে রাখা, তাদের উপর অত্যাচার করা, এটা তো দেশপ্রেম নয়। সাম্প্রদায়িকতা কখনওই দেশপ্রেম নয়, তা সে হিন্দুদের মধ্যে হোক বা মুসলিমদের মধ্যে হোক বা অন্য কোনও ধর্মের মানুষের মধ্যে হোক। আমাদের ইতিহাস যদি ঠিক করে পড়া যায়, তাহলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে কার কী অবদান রয়েছে।
হিন্দুত্ববাদীদের দিক থেকে বরাবরই অত্যাচারী, হিন্দুবিরোধী শাসক বলে আওরঙ্গজেবকে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিকৃত ভাষ্যকেই ইতিহাস বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হচ্ছে। এমনকি ঐতিহাসিক তথ্য সহ আওরঙ্গজেব সম্পর্কে কথা বললেও দেশদ্রোহী তকমা দেওয়া হচ্ছে, পাকিস্তান পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কোনও ছোটখাটো হিন্দুত্ববাদী নেতা নয়, মুখ্যমন্ত্রী-উপমুখ্যমন্ত্রীর পদে থাকা দায়িত্বশীলরা এমন কথা বলছেন। মহারাষ্ট্র বিধানসভা থেকে এক বিধায়ককে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়েছে এই কারণে যে, তিনি শুধু বলেছিলেন আওরঙ্গজেব হিন্দু-বিরোধী ছিলেন না। একই রকম আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে বিহারের শাসক দল জেডি(ইউ)-র এক বিধায়ককে। একটি ভাষ্য দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করা হয়েছে যে, দেশের ধর্মনিরপেক্ষ এবং বামপন্থী ইতিহাসবিদরা ইচ্ছাকৃতভাবে সম্রাট অশোক এবং মুঘল শাসকদের মহান বানিয়েছেন।
হিন্দু রাজাদের সেই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তারই জেরে বর্তমানে স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্য তালিকা থেকে এদের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ অশাক তাঁর শিলালিপিতে অনেক কথা বলে গেছেন কী করা উচিত। তার মধ্যে তিনি বলেছেন, অসহিষ্ণুতা একেবারেই থাকা উচিত নয়। ধর্ম সম্পর্কে অশোকের ধারণা সম্পূর্ণ সহনশীলতার উপরে প্রতিষ্ঠিত। তিনি অন্য ধর্মকেও সম্মানের কথা বলেছেন। অশোকের ধর্মে জাতপাতের কোনও কথা নেই। মনুস্মৃতি বা গুপ্তযুগের শিলালিপি দেখলে কোথাও এটা দেখা যাবে না। এখন ইউজিসি-র সিলেবাসে অশোকের সামান্যই উল্লেখ আছে। অথচ অশোক পুরো ভারতে লিপির প্রসার করেছেন। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বিশ্বে যখন হিন্দুস্তান বা ভারত নিয়ে আলোচনা হয়, তখন অশোক ও আকবরের কথা বলা হয়। আওরঙ্গজেবকে লেখা একটি চিঠিতে শিবাজি বলেছিলেন, আপনার উচিত আকবরের নীতি অনুসরণ করা। শিবাজির সমগ্র কাজকর্মে কোথাও ধার্মিক অসহিষ্ণুতা ছিল না। ধর্মের নিজস্ব জায়গা ছিল কিন্তু সরকারের যে নীতি ছিল, সেটাকে আজকের ভাষায় ধর্মনিরপেক্ষই বলা উচিত। উল্লেখ্য, বৌদ্ধ ধর্ম যখন এলো, পাঁচ-সাতশো বছর তা প্রভাবশালী ছিল। তার সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সংঘর্ষ তো ছিলই। ভারতের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের সংঘর্ষ থাকলেও সাধারণভাবে সহনশীলতা ছিলই।
আওরঙ্গজেবের সময়ে যত বিদেশি পর্যটক এসেছেন, তাঁদের লেখায় কোথাও পাওয়া যায় না যে এটা অসহিষ্ণু দেশ। তাঁদের একজনেরও মনে হয়নি যে, এখানে হিন্দুদের উপর অত্যাচার হচ্ছে, যদিও জিজিয়া কর ছিল। তবে বৃন্দাবন নথিপত্র থেকে দেখা যায় যে, তা বেশির ভাগই আদায় হতো না, সেটা অবশ্য অন্য প্রসঙ্গ। বিদেশি পর্যটকরা বিস্মিত হয়েছেন যে, এখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ সব ধর্মের লোক শান্তিতে আছেন, যা ইউরোপেও ছিল না। ভারত ছাড়া ইরান ইত্যাদি দেশেও ছিল না, সেখানে শুধু মুসলমান ছিল।
দুনিয়ার যে কোনও দেশের ইতিহাস পড়তে গেলে তার সংস্কৃতি দেখা হয়। তার মধ্যে যুক্তিবাদ কতটা আছে, তা বিবেচনা করা হয়। আকবরের সময়েও এই আশ্চর্যরকমের যুক্তিবাদ ছিল। আকবরের সময়ে বসে আবুল ফজল ইসলামের ইতিহাস নিয়ে সমালোচনা করে বলেছেন, এটা ভুল হয়েছে। ধর্মের কী অধিকার ছিল শাসন করার! তা নিয়ে ওই সময় উলেমারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। মহারানা প্রতাপ, মান সিংয়ের ইতিহাস লেখা সম্ভব হতো না আকবরের কথা বলা না হলে। শাহজাহানের সময় সব ধর্ম নিয়ে একটি বই লেখা হয়েছিল ফার্সিতে, ‘দাবিস্তান-ই-মজাহিব’। তাতে পার্সিয়ান, ইসলাম, শিখ, বৌদ্ধ, হিন্দু সব ধর্মের কথা লেখা হয়েছিল। উনিশ শতকে বইটির অনুবাদের সময় অনুবাদক বলেছিলেন, এটি অনন্য। অতীতেও আমাদের এমন একটা সংস্কৃতি ছিল, যা ছিল সহনশীল।