• facebook
  • twitter
Sunday, 6 April, 2025

নাম উপড়ে ফেলা হল

নৈরাজ্যের বাংলাদেশে এখন শুধু অনাচার আর অবিচারই চলছে

মনীষীদের নামাঙ্কিত যা কিছু আছে বাংলাদেশে, সবই মুছে ফেলা হবে। শুধু তাই নয়, তাঁদের নাম করাও গুরুতর অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। সম্প্রতি তার আনুষ্ঠানিক সূচনা হল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিজ্ঞানী আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, কবি জীবনানন্দ দাশ এবং মানবতাবাদী লালন সাঁই— এঁরা সবাই বাংলাদেশের ইউনূস সরকারের কাছে অবাঞ্ছিত। তাঁদের নাম উচ্চারণ করা যাবে না। এই অবাঞ্ছিত কথাটা লিখতেও এই প্রতিবেদকের কলম কাঁপছে। শুধু তাই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র হিন্দু উপাচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদারের নামও উপাচার্যদের তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্র্রার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানিয়ে দিলেন। বৈষম্য বিরোধী ইউনূস খানের ছাত্র শাখা হেফাজতি ইসলামী ছাত্র সংগঠন এবং পাকিস্তানপন্থী ছাত্রদের প্রচণ্ড চাপে পড়ে এই মনীষীদের স্মৃতিতে যেসব ভবন বা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছিল, তার পরিবর্তন করা হল। টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরে রানি ভবানী হাইস্কুলের প্রাঙ্গনে যে লালন মেলার আয়োজন করা হয়েছিল সম্প্রতি, তা স্থানীয় প্রশাসন বন্ধ করে দিল। লালন অনুরাগীদের এই মেলায় যোগদান অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে বলে প্রশাসন জানিয়ে দেয়। এর আগে বাংলাদেশের অন্যত্রও লালনমেলা হতে দেওয়া হয়নি।

হেফাজতি ইসলামী ছাত্র সংগঠন এবং ইউনূস খানের সমর্থক ছাত্ররা প্রশ্ন তুলেছে, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের কবি— সুতরাং তাঁর গান ‘সোনার বাংলা…’ কেন জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হবে? তার পরিবর্তে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলামের কোনও গানকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হোক। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার একটি বিজ্ঞপ্তিতে ১৬ ভবনের নাম বদলের কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট বৈঠকে এই হিন্দু মনীষীদের নামে যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার নাম বদলের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

তবে তিনটি ভবনের নাম বদল করা হয়নি। তা হল মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজি নজরুল ইসলাম নামাঙ্কিত ভবন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষা ভবনের থেকে কবির নাম উপড়ে ফেলেনি। সিন্ডিকেট হাত লাগায়নি মাইকেল মধুসূদন দত্তের নামে অতিথি ভবন। তবে জাতির পিতা মুজিবুর রহমান হলের নাম পাল্টে, তাঁর নাম রাখা হয়েছে— বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন হল। বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হল হয়েছে ‘বিজয় ২৪ হল’। ‘জাতীয় স্লোগান জয় বাংলার নামে ‘জয় বাংলা ভবন’কে নাম দেওয়া হয়েছে একাডেমিক ভবন। এখানে উল্লেখ্য, তদারকি সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েই মুক্তিযুদ্ধের সময় জয় বাংলা স্লোগান যা মুখে মুখে উচ্চারিত হত, তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এখন কেউ ভুল করেও যদি জয় বাংলা স্লোগান তোলে, সঙ্গে সঙ্গে তাকে পাকড়াও করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে। কেন লালনের মেলা মধুপুরে বন্ধ করা হল, এই প্রশ্নের উত্তরে ইউনূস খানের উপদেষ্টা জানান, লালনের ভ্রান্ত আদর্শের প্রচার এ দেশে প্রচার করতে দেওয়া হবে না। তাই লালন অবাঞ্ছিত। তদারকি সরকারের প্রধান ইউনূস খানের অনুগত ছাত্ররা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল এই সব মনীষীদের নামে যেসব ভবন বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার নাম পাল্টে ফেলতে হবে। তা না হলে হেফাজতি ইসলামপন্থীরা এবং অন্যান্য মৌলবাদী ছাত্র সংগঠন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ঘেরাও করবে এবং কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যথোচিত ব্যবস্থা নেবে। এই বিশ্ববিদ্যালয় আর কালবিলম্ব না করে তড়িঘড়ি সিন্ডিকেট মিটিং ডেকে এই সব নাম উপড়ে ফেলে নতুন নামকরণের প্রস্তাব নেয়।

একদা পূর্ববাংলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে খ্যাতনামা শিক্ষাবিদরা অধ্যাপনায় নিয়োজিত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথিতযশা শিক্ষকেরা ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু এবং বাংলা সাহিত্যের সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার অন্যতম। স্বাধীনতার পর এই সব অধ্যাপকরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন এবং অনেকেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। একদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই খ্যাতনামা হিন্দু শিক্ষাবিদরা বেশি সংখ্যায় ছিলেন। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই সব মনীষীদের নাম পাল্টানোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। কিন্তু তাদের মুখে কুলুপ আঁটা। স্বাধীনভাবে তাঁদের মতামত পেশ করার অধিকার কেড়ে নিয়েছে বর্তমান সরকার। তাই তাঁরা নীরবে এই অন্যায় অবিচার সহ্য করছেন।

কিন্তু ইউনূস অনুগত যেসব ছাত্র সংগঠন এখন বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গণে খবরদারি চালাচ্ছে— তারা কি আসলে ছাত্র? এই প্রশ্ন তুলেছে অনেকে। এটা অবশ্য ঠিক, এই ছাত্ররা এই মনীষীদের নাম জানে না। তাই বলে ইতিহাসকে এইভাবে মুছে ফেলা? এরা ছাত্র নয়, ছাত্র নামের কলঙ্ক, বলে ঢাকার কবি-সাহিত্যিকরা তাদের আখ্যায়িত করেছেন। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ছাত্ররা এখন রাজনীতিই বেশি করছে, পড়াশোনা বাদ দিয়ে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যালঘু ছাত্রদের ছাত্রাবাস ‘জগন্নাথ হল’ নিয়েও। এই হলের নাম পাল্টে ফেলার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে হেফাজতি ইসলামী চাত্র সংগঠন। কিন্তু নাম পাল্টে ফেলেই কি এই সব কৃতী শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানীদের অবদান ভোলা যায়?

নৈরাজ্যের বাংলাদেশে এখন শুধু অনাচার আর অবিচারই চলছে। ভবিষ্যতে হয়তো বাংলাদেশ একটি ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। সেখানে সংখ্যালঘুরা থাকতে পারবে কিনা, তাঁরা তাঁদের ধর্ম পালন করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমান্ডির ঐতিহাসিক বাড়ি যেদিন ভেঙেচুরে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হল, সেদিন কিছু ছাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের নতুন পতাকা ওড়াতে দেখা যায়। এই ছাত্ররা এখন গোপালগঞ্জের ঢুঙ্গিপাড়ায় মুজিবের সমাধি ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু এখানকার মানুষও তৈরি তাদের প্রতিহত করতে। এদিকে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার শাখা বাংলাদেশের অরাজকতা হত্যাকাণ্ডগুলি নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে ইউনূস খান সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বর্বরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।