সুদর্শন নন্দী
শ্রীরামকৃষ্ণ যে সময়ের মানুষ, তা ভারতের ইতিহাসে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ও বর্ণময় অধ্যায়। ভারতে, বিশেষ করে বাংলার বুকে তখন সমাজজীবন, সাহিত্য, জ্ঞানচর্চা, শিল্প— সবদিকেই নবজাগরণের আলোড়ন উঠেছে, আর সেই আলোড়নের ঢেউ লাগছে সারা ভারতে। একদিকে ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলন, আরেক দিকে খ্রিষ্টান মিশনারিদের ধর্মান্তকরণের প্রচেষ্টা মানুষকে বিভ্রান্ত করে তুলেছিল। শ্রীরামকৃষ্ণ এই নবজাগরণের একজন প্রধানতম নায়ক— আধ্যাত্মিকতার জগতে তিনি বিপ্লব এনে দিলেন। তার কথামৃতের প্রভাবে দিকভ্রান্ত মানুষ আধ্যাত্মিক জীবনে এক সঠিক পথের দিশা পেল। নরেনের মতো এক শিক্ষিত, বাগ্মী, সাহসী যুবক যিনি ইশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে বিভ্রান্ত, এমনকি তাঁর ব্রাহ্ম সমাজেও সঠিক উত্তর পাননি, তাঁকেও ঠাকুর আধ্যাত্মিক মরুদ্যানের পথটি দেখিয়ে দিয়েছিলেন। ঠাকুরের ইশ্বর-ব্যাখ্যায় তথা ধর্ম ব্যাখ্যায় ব্রাহ্মনেতা কেশব সেন, বিখ্যাত নাট্যকার গিরিশ ঘোষ, কথামৃতকার তথা শিক্ষক মহেন্দ্র গুপ্তের মতো হাজার হাজার ঈশ্বর পিপাসী মানুষ অমৃত পথের সন্ধান পেয়েছিলেন। আমরা জানি, ঠাকুর যে শুধু হিন্দুধর্মকে আত্মস্থ করেছিলেন তা নয়, সেই আত্মস্থ যখন সম্পূর্ণ হল, রামকৃষ্ণ তখন অন্য ধর্মগুলির দিকে মন দিলেন। একে একে ইসলাম, খ্রীষ্টধর্ম ও শিখধর্মের পথে তিনি এগোলেন, ও প্রতিটিতেই সফলকাম হলেন। যীশুখ্রীষ্ট ও হজরত মহম্মদের দর্শনও তিনি পেয়েছিলেন। এতদূর এসে তিনি পরিষ্কার বুঝলেন যে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মগুলি আসলে একই লক্ষ্যে পৌঁছনোর আলাদা আলাদা রাস্তা মাত্র। তিনি বারবার বললেন, ‘যত মত, তত পথ’।
শ্রীরামকৃষ্ণকে আমরা বলি ভগবানের অবতার। তাঁকে মানুষ ভগবান বা ঈশ্বর ভেবে যেমন শ্রদ্ধা-ভক্তি করে তেমনি বেশি শ্রদ্ধা করে তাঁকে অত্যন্ত আপনজন ভেবে। আজ ঘরে ঘরে ছবির মাধ্যমে তিনি উপস্থিত। তাঁর কথামৃত পড়ে মানুষ জীবনের অমৃত লাভ করেন। এককথায় সর্বত্রই তিনি এখন শ্রদ্ধার আসনটি অলঙ্কৃত করছেন। তাঁর জীবন-দর্শন দিশেহারা মানুষের পথপ্রদর্শক। গৃহী-ত্যাগী নির্বিশেষে সকলের দৈনন্দিন জীবনে তাঁর জীবনবাণী আজ অপরিহার্য।
সমাজের বেশিরভাগ মানুষ আজ ভোগবাদী। মানুষের কাছে ত্যাগ, সেবা, বিবেক, চরিত্রগঠন এসব ম্যাড়ম্যাড়ে শব্দগুলি ব্রাত্য একপ্রকার| ভোগই যেন চরম সত্য| সত্যি বলতে কি, জীবের দুর্দর্শার মুলে কিন্তু তার এই চাই চাই বাসনা | এই ভোগের পিছনে ছুটতে গিয়েই আর সংসার সংসার করে মানুষ আদতে মান আর হুঁশ হারিয়ে অমানুষই যে হয়ে উঠছে তা বলাই বাহুল্য | প্রাচুর্যের মধ্যেও সে হাঁপিয়ে উঠছে আজ| আকাঙ্ক্ষা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে, তৃষ্ণা কিছুতেই আর মিটতে চায় না| অথচ সংসার করেও এই ঝড় থেকে আমরা কিন্তু রক্ষা পেতে পারি প্রেম ও ত্যাগের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পাদস্পর্শে এসে, তার অমূল্য উপদেশ পাথেয় করে | মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য কি তা এককথায় তিনি জানিয়েছেন | মানুষের উদ্দেশ্য হল ঈশ্বর লাভ | আর তা সংসার করেও যে করা যায় তা ঠাকুর বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে বারবার বলেছেন |
ঠাকুর বলেছেন— ঈশ্বরে ভক্তিলাভ না করে যদি সংসার করতে যাও তাহলে আরও জড়িয়ে পড়বে সংসারের জাঁতাকলে। বিপদ, শোক, তাপ এ-সবে অধৈর্য হয়ে যাবে। আর যত বিষয়-চিন্তা করবে ততই আসক্তি বাড়বে। তিনি বললেন, ঈশ্বরের নামগুণগান সর্বদা করতে হয়। আর সৎসঙ্গ – ঈশ্বরের ভক্ত বা সাধু, এঁদের কাছে মাঝে মাঝে যেতে হয়। সংসারের ভিতর ও বিষয়কাজের ভিতর রাতদিন থাকলে ঈশ্বরে মনে হয় না। তাই মাঝেমাঝে নির্জনে গিয়ে তাঁর চিন্তা করা বড় দরকার। তিনি বলেছেন, প্রথম অবস্থায় মাঝে মাঝে নির্জন না হলে ঈশ্বরে মন রাখা বড়ই কঠিন। কিছুদিন নির্জনে থাকতে হয়। বুড়ি ছুঁয়ে ফেললে আর ভয় নাই। নির্জনে সাধনের সময় ভাববে, আমার কেউ নাই; ঈশ্বরই আমার সর্বস্ব। আর কেঁদে কেঁদে তাঁর কাছে জ্ঞান-ভক্তির জন্য প্রার্থনা করবে।
ঠাকুর কিন্তু সংসারের কোন কাজই করতে মানা করছেন না| বাপ, মা ছেলেপুলে ছেড়েও থাকতে বলছেন না , তিনি বলছেন-সব কাজ করবে কিন্তু মন ঈশ্বরেতে রাখবে। স্ত্রী, পুত্র, বাপ, মা— সকলকে নিয়ে থাকবে ও সেবা করবে । যেন কত আপনার লোক। কিন্তু মনে জানবে যে, তারা তোমার কেউ নয়।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলছেন-বড় মানুষের বাড়ির দাসী সব কাজ কচ্ছে, কিন্তু দেশে নিজের বাড়ির দিকে মন পড়ে আছে। আবার সে মনিবের ছেলেদের আপনার ছেলের মতো মানুষ করে। বলে ‘আমার রাম’ ‘আমার হরি’, কিন্তু মনে বেশ জানে—এরা আমার কেউ নয়। কচ্ছপ জলে চরে বেড়ায়, কিন্তু তার মন পড়ে আছে আড়ায়। যেখানে তার ডিমগুলি আছে। তেমনি, সংসারের সব কর্ম করবে, কিন্তু ঈশ্বরে মন ফেলে রাখবে | তেল হাতে মেখে তবে কাঁঠাল ভাঙতে হয়! তা না হলে হাতে আঠা জড়িয়ে যায়। ঈশ্বরে ভক্তিরূপ তেল লাভ করে তবে সংসারের কাজে হাত দিতে হয়।
একবার বিনীতভাবে কথামৃতকার জিজ্ঞাসা করেছিলেন ঠাকুরকে— সংসারে কিরকম করে থাকতে হবে?
ঠাকুর বারবার বলেছেন- ভক্তিলাভ করতে হলে নির্জন হওয়া চাই। মাখন তুলতে গেলে নির্জনে দই পাততে হয়। দইকে নাড়ানাড়ি করলে দই বসে না। তারপর নির্জনে বসে, সব কাজ ফেলে দই মন্থন করতে হয়। তবে মাখন তোলা যায়। আবার দেখ, এই মনে নির্জনে ঈশ্বরচিন্তা করলে জ্ঞান বৈরাগ্য ভক্তি লাভ হয়। কিন্তু সংসারে ফেলে রাখলে ওই মন নীচ হয়ে যায়। সংসারে কেবল কামিনী-কাঞ্চন চিন্তা।সংসার জল, আর মনটি যেন দুধ। যদি জলে ফেলে রাখ, তাহলে দুধে-জলে মিশে এক হয়ে যায়, খাঁটি দুধ খুঁজে পাওয়া যায় না। দুধকে দই পেতে মাখন তুলে যদি জলে রাখা যায়, তাহলে ভাসে। তাই নির্জনে সাধনা দ্বারা আগে জ্ঞানভক্তিরূপ মাখন লাভ করবে। সেই মাখন সংসার-জলে ফেলে রাখলেও মিশবে না, ভেসে থাকবে। সঙ্গে সঙ্গে বিচার করা খুব দরকার। কামিনী-কাঞ্চন অনিত্য। ঈশ্বরই একমাত্র বস্তু।
এক ব্রাহ্মভক্তর মনে প্রশ্ন | তাহলে কি সংসার ত্যাগ না করলে ঈশ্বর লাভ হবে না?
ঠাকুর ঐ ভক্তের প্রশ্নে অভয় দিয়ে বলছেন-নাগো! তোমাদের সব ত্যাগ করতে হবে কেন? তোমরা রসে-বসে বেশ আছ। সা-রে-মা-তে! তোমরা বেশ আছ। নক্স খেলা জানো? আমি বেশি কাটিয়ে জ্বলে গেছি। তোমরা খুব সেয়ানা। কেউ দশে আছো; কেউ ছয়ে আছো; কেউ পাঁচে আছো। বেশি কাটাও নাই; তাই আমার মতো জ্বলে যাও নাই। খেলা চলছে— এ তো বেশ। ঠাকুর জোর দিয়ে ভক্তদের মনে আশা জাগিয়ে ইশ্বরমুখী করে বলছেন— সত্য বলছি, তোমরা সংসার করছ এতে দোষ নাই। তবে ঈশ্বরের দিকে মন রাখতে হবে। তা না হলে হবে না। একহাতে কর্ম কর, আর-একহাতে ঈশ্বরকে ধরে থাক। কর্ম শেষ হলে দুইহাতে ঈশ্বরকে ধরবে।
কি অপূর্ব ব্যাখ্যা ঠাকুরের!
ঠাকুর বারে বারে জনক রাজার উদাহরণ টেনেছেন| বলেছেন, সংসারে ঈশরলাভ হবে না কেন? জনকের হয়েছিল।কিন্তু ফস করে জনক রাজা হওয়া যায় না। জনক রাজা নির্জনে অনেক তপস্যা করেছিলেন। সংসারের বাইরে একলা গিয়ে যদি ভগবানের জন্য তিনদিনও কাঁদা যায় সেও ভাল। এমনকি অবসর পেয়ে একদিনও নির্জনে তাঁর চিন্তা যদি করা যায়, সেও ভাল। জানবে ঈশ্বরই সৎ, নিত্যবস্তু। আর সব অসৎ, অনিত্য; দুদিনের জন্য। এইটি বোধ আর ঈশ্বরে অনুরাগ। তাঁর উপর টান—ভালবাসা। গোপীদের কৃষ্ণের উপর যেরূপ টান ছিল।
এক সংসারি ভক্ত জিজ্ঞাসা করেছিলেন ঠাকুরকে, গৃহস্থাশ্রমে কি ভগবান লাভ হয়?
ভক্তের প্রশ্নের উত্তরে ঠাকুর বলছেন—কেন হবে না? পাঁকাল মাছের মতো থাক। সে পাঁকে থাকে, কিন্তু গায়ে পাঁক নাই। আর ঘুষকীর মতো থাক। সে ঘর-কন্নার সব কাজ করে কিন্তু মন উপপতির উপর পড়ে থাকে। ঈশ্বরের উপর মন ফেলে রেখে সংসারের কাজ সব কর। কিন্তু তা বড় কঠিন। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, যে-ঘরে আচার তেঁতুল আর জলের জালা সেই ঘরেই বিকারের রোগী থাকলে কেমন করে রোগ সারবে? আচার তেঁতুল মনে করলে মুখে জল সরে। পুরুষের পক্ষে স্ত্রীলোক আচার তেঁতুলের মতো। আর বিষয় তৃষ্ণা সর্বদাই লেগে আছে; এ তৃষ্ণার শেষ নাই। বিকারের রোগী বলে, এক জালা জল খাব! বড় কঠিন।
ঠাকুর বিভিন্ন উপমা দিয়ে সংসারীদের ঈশ্বরে মন রাখার কথা বার বার বলেছেন | তিনি সংসারীদের জন্য ইশ্বরলাভের যে দিশা বা পথ দেখিয়েছেন সেই পথে সংসারিরা হাঁটলে সংসারী বা গৃহস্থরা জীবনের যা উদ্দেশ্য অর্থাৎ ইশ্বরলাভ করবেনই| লাভ করতে পারলে, সংসার আর অসার বলে বোধ হবে না।
এভাবেই শ্রীরামকৃষ্ণদেব দিকভ্রান্ত তৃষ্ণার্ত ভক্তদের অমৃত-উদ্যানে পৌঁছে দিয়েছিলেন।