দেশে বন্ধ্যা অর্থনীতি তার সঙ্গে মোদীর প্রিয় বন্ধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যিক নীতি ভারতের অর্থনীতির সঙ্কটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। ট্রাম্প ভারতকে মার্কিন পণ্যে শুল্ক প্রাচীর প্রত্যাহারের যে চাপ দিচ্ছে তার প্রতিবাদ করা উচিত ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদীর। সম্প্রতি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মার্কো ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে তাঁর শুল্ক প্রাচীর প্রত্যাহারের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি যা বলছেন তা ভুল। কিন্তু মোদী ট্রাম্পের দেশ আমেরিকায় গিয়ে সেদেশের পণ্যে শুল্ক প্রাচীর তুলে দেওয়ার কথা বললেও তার প্রতিবাদ করেননি। তিনি চুপ করে থেকেছেন। ট্রাম্পের প্রস্তাব মতো যদি আমেরিকার আমদানি করা আপেলে শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে দেশের নিজস্ব উৎপন্ন আপেলের বাজার নষ্ট হবে। একইভাবে আমেরিকার গাড়ির, ইলেকট্রনিক্স পণ্যে শুল্ক তুলে নেওয়া হলে দেশের গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স শিল্পের পণ্যের বাজার নষ্ট হয়ে যাবে। এতে দেশে শিল্প সঙ্কট নেমে আসবে। দেশের শিল্প রক্ষায় মোদীর উচিত ছিল বন্ধু ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির বিরোধিতা করা। ট্রাম্পের প্রস্তাব খারিজ না করলে মোদীর জমানায় ধসে পড়া অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বংসের পথে যেতে বেশি সময় লাগবে না।
অর্থনীতিতে বন্ধ্যা চলায় শিল্পে নতুন বিনিয়োগ কমেছে, একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ বিপুল হারে কমছে। অর্থনীতির এই বন্ধ্যা অবস্থার মূল কারণ হলো, মজুরি এবং বেতন বৃদ্ধি না হওয়া। কৃষিতে অসংগঠিত ক্ষেত্রে মজুরি বাড়েনি। তার মধ্যে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রকৃত মজুরি, বেতন কমে গিয়েছে। এই মজুরি না বাড়ার কারণে দেশে আজকে অস্বাভাবিক হারে পারিবরিক ঋণ বেড়ে চেলেছে। মহামারীর পর অর্থনীতিতে পরিবারের ঋণের বোঝার সঙ্কট এবার সামনে চলে এলেও মোদী সরকার এই বেহাল অবস্থার কথা স্বীকার করতে চাইছে না।
মোদীর অর্থনীতিতে দেশে সাধারণ মানুষের পকেট খালি হচ্ছে, অন্যদিকে পাকেট ভারী হচ্ছে মুষ্টিমেয় ধনকুবেরদের। বিকশিত ভারতে বেশিরভাগ মানুষেরই শখ মেটানোর পয়সা নেই। দেশের ১০০ কোটি মানুষের হাতে শখে খরচ করার অতিরিক্ত অর্থ নেই অর্থাৎ সঞ্চয় বলতে কিছুই নেই। মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে বিলাস ও নানা শখ মেটাতে রয়েছে অতিরিক্ত অর্থ। ফলে ধারে ও ঋণে ডুবে রয়েছে দেশের বেশির ভাগ পরিবার। বাণিজ্য সমীক্ষক সংস্থা ব্লুম ভেঞ্চার প্রকাশিত ইন্দাস ভ্যালি অ্যানুয়াল রিপোর্ট ২০২৫-এ ভারতের সাধারণ পরিবারের এই ঋণে জর্জর আর্থিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ওই রিপোর্ট জানাচ্ছে, ভারতের অর্থনীতির বাজার সাধারণ মানুষের আয়ের উপর বেশি নির্ভর করে না। কারণ, তাদের বাজারে অতিরিক্ত খরচ করার মতো অর্থ হাতে নেই। তার বেশিরভাগ আজ ধারে-ঋণে বিপর্যস্ত। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তার রিপোর্টে পরিবার পিছু ঋণ বেড়ে চলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভারতের অর্থনীতিতে সাধারণ পরিবারগুলি ধারে-ঋণে জর্জরিত। এটাই মোদীর ‘বিকশিত ভারত’।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্টে দেখা যায় এক সময়ে শিল্পে ঋণের যে হার তাকে ছাপিয়ে বেড়ে যায় ব্যক্তিগত ঋণের হার। বেসরকারি শিল্পের বিনিয়োগ এই সময়ে কমে যায়। শুধু ব্যাঙ্কে ব্যক্তিগত ঋণ বেড়ে চলা নয় এই সময় বেড়েছে স্বল্প মেয়াদী ক্ষুদ্র ঋণ, চিটফান্ড ও মহাজনী সংস্থায় ক্ষুদ্র ঋণ। ২০২৪ সালে এইসব ক্ষুদ্র ঋণ বেড়ে হয়েছে ব্যক্তিগত ঋণের ৮২ শতাংশ। পরিবারের এই ঋণ বেড়ে চলায় বাজারে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা যত না বেড়েছে তার থেকে বেশি বেড়েছে পরিবারের ঋণের বোঝা। পরিবারের এই ঋণ এই সময়ে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। তা আমাদের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (ডিজিপি) ৪৩ শতাংশ হয়েছে। যা পারিবারিক ঋণের সর্বকালীন বৃদ্ধি।
পরিবারের ঋণের বোঝা বেড়ে চলায় তার সঞ্চয়ের হারও কমে চলেছে। ২০০০ সালে পরিবারের ব্যাঙ্কে সঞ্চয়ের হার ছিল মোট সঞ্চয়ের ৮৪ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা কমে নেমে এসেছে ৬১ শতাংশে। সঞ্চয় কমে আসার প্রধান কারণ হলো এই সময়ে কর্পোরেট বিপুল মুনাফা করলেও তারা মজুরি ও বেতন বাড়ায়নি। শিল্পে নতুন বিনিয়োগ করেনি। ফলে কর্পোরেট হাতে মুনাফার অর্থ জমলেও সাধারণ মানুষের হাতে অর্থ নেই। ফলে সঞ্চয় করার মতো অতিরিক্ত অর্থ সাধারণ মানুষের হাতে না থাকায় তাদের সঞ্চয় কমেছে, অন্যদিকে পরিবারে ঋণের বোঝা বেড়েছে।