• facebook
  • twitter
Sunday, 6 April, 2025

আরজি কর কাণ্ড : অবশেষে অনেক প্রশ্ন নিয়ে নিম্ন আদালতে শাস্তির রায় ঘোষণা

একা সঞ্জয় রাইয়ের পক্ষে এ কাজ কখনওই সম্ভব নয়, সেদিন আরও অনেকেই যুক্ত ছিল সরকারি হাসপাতাল কম্পাউন্ডে সংঘটিত পড়ুয়া-চিকিৎসকের নৃশংস ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায়।

ফাইল চিত্র

বরুণ দাস

অবশেষে পাঁচ মাসের মাথায় আরজি কর কাণ্ডে ‘মূল অভিযুক্ত’-এর বিরুদ্ধে শাস্তি ঘোষণা করলেন শিয়ালদা নিম্ন আদালতের মাননীয় বিচারক। উল্লেখ্য, প্রথমে রাজ্য পুলিশ এবং পরে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই-এর তদন্ত ও আদালতে দীর্ঘ শুনানির পর সম্প্রতি রায় ঘোষণা করেছেন মাননীয় বিচারপতি। অভিযুক্তের চরম শাস্তি তথা ফাঁসির দাবিতে যাঁরা সরব ছিলেন, তাঁদেরকে অনেকটাই হতাশ করেছে মহামান্য আদালতে অপরাধী সাব্যস্ত হওয়া অভিযুক্ত সঞ্জয় রাইয়ের আজীবন কারাদণ্ডের শাস্তি।

এই হতাশার দলে আছেন রাজ্যের নির্বাচিত প্রশাসনিক প্রধান মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীও। তিনিও তাঁর দলের তরফে রাজপথে নেমে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে প্রথম থেকেই আরজি কর কাণ্ডে অভিযুক্ত তথা অপরাধীর ‘কড়া শাস্তি’ তথা ফাঁসির দাবিতে বিশেষভাবে সরব ছিলেন। অপরাধীর ফাঁসির দাবিতে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর এই সরবতা কতটা নীতি-নৈতিকতার মধ্যে পড়ে তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতেই পারে। বিশেষ করে বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই যখন মৃত্যুদণ্ড (ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট) উঠে গেছে।

সভ্য দুনিয়ায় মৃত্যুদণ্ড (ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট)-এর কোনও স্থান নেই একথা আমরা অনেকেই জানি। এদেশে এ রাজ্যে হেতাল পারেখ খুন ও ধর্ষণের মামলায় ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের ফাঁসির সময় থেকেই মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে অনেক মানবতাবাদী সংগঠন সরব হয়েছিল। কারণ দেখা গেছে, যেসব দেশে এখনও মৃত্যুদণ্ড বহাল আছে, সেখানেও খুন ও ধর্ষণের মতো ‘বিরলতম অপরাধ’ বন্ধ হয়নি। অন্যদিকে যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ড তুলে দেওয়া হয়েছে, সেসব দেশে খুন ও ধর্ষণের ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম।

কাজেই ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ডের মতো কড়া বা ‘চরম শাস্তি’র ব্যবস্থা থাকলেই যে দেশ বা সমাজ থেকে ধর্ষণ ও খুনের মতো ‘বিরলতম অপরাধ’ বন্ধ হবে এমন কোনও কথা নেই। তথ্য-নির্ভর পরিসংখ্যান তো বটেই, বাস্তবও অন্ততঃ সেকথারই প্রমাণ দেয়। ফলে যারা ‘বিরলতম অপরাধ’-এর জন্য ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ডের মতো ‘চরম শাস্তি’র আইনি ব্যবস্থা চান, তাঁদের চিন্তাভাবনার বদল আনা দরকার। বাস্তবকে অস্বীকার বা অগ্রাহ্য করে চলা তো অপরিমানদর্শিতার প্রমাণ দেয়। তা কি ঠিক?

অনেকেই হয়তো যুক্তি দিয়ে বলবেন, নির্যাতিতার বাবা-মা এবং আত্মীয়-পরিজনের শোক-যন্ত্রণা অন্যেরা বুঝবেন কী করে? কথাটা পুরোটাই ঠিক। এ নিয়ে বিতর্কের কোনও অবকাশই নেই। কারণ অন্যের শোক-যন্ত্রণা কাছের লোকজন যতটা বুঝবেন, অন্যদের পক্ষে তার সবটা বোঝা কঠিন নিশ্চিত। কথায়ই আছে ‘যার যায় তার যায়’। ‘যার যায় না’— সে কী করে বুঝবে যন্ত্রণার তীব্রতা? অনুভবী মানুষ আর ক’জন আছেন আমাদের মধ্যে? বিশেষ করে আজকের ভোগবাদী (বা পণ্যবাদি) সময়ে?

মৃতার প্রিয় পরিবার-পরিজনের কাছে অপরাধীর চরম শাস্তি ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে। প্রকৃতিগত প্রতিশোধ-স্পৃহার গনগনে আগুনে কিছুটা হয়তো-বা জল ঢালতে পারে। তার বেশিকিছু নয়। কিন্তু ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড কখনও খুন বা হত্যার মতো জঘন্যতম অপরাধকে কোনওভাবেই দমাতে পারে না। তাই আজকের সভ্য দুনিয়ায় ফাঁসি তথা মৃত্যুদণ্ডের দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে গোটা বিশ্বজুড়েই সংশয় তো বটেই, অনিবার্য প্রশ্নও উঠেছে। আমাদেরকে তা অস্বীকার করলে চলবে কী করে!

নিম্ন আদালতে অপরাধীর শাস্তি হিসেবে আজীবন কারাদণ্ড ঘোষণার পর মাননীয় বিচারকের পর্যবেক্ষণে আরজি কর কাণ্ডে তদন্ত সংক্রান্ত বিষয়ে যেসব ফাঁক-ফোকরের কথা উঠে এসেছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনেও কিন্তু সন্দেহ ও সংশয়ের অবকাশ থেকে যায়। এজন্য আইন-বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। যেসব নিয়ে রাস্তাঘাটে, পাড়ার চায়ের দোকানে, অফিস-কাছারিতে, মাঠে-ময়দানে সাধারণ মানুষের মধ্যে আলাদা আলোচনাও হতো। এই আলাপ-আলোচনার মধ্যে যথেষ্ট যুক্তিও ছিল নিঃসন্দেহে।

এমন কি, প্রতিবাদী গণ-মিছিলে যেসব প্রশ্ন উঠে এসেছিল, তার অনেকটাই মাননীয় বিচারপতির পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে। বলা যায়, প্রশ্নগুলি যথাযথ মান্যতাও পেয়েছে। তাই সবদিক পর্যালোচনা করে অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়াটা হয়তো কোনওভাবেই ঠিক হতো না। এবং সেই যৌক্তিক কাজটিই তাঁর রায়দানে করেছেন মাননীয় বিচারপতি অনির্বাণ দাস মহাশয়। কারণ আদালত-গ্রাহ্য ‘হার্ড এভিডেন্স’ ছাড়া বিচারকের চেয়ারে বসে কখনও কোনও আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। নেওয়া ঠিকও নয় নিঃসন্দেহে।

এমনকি, নির্যাতিতার বাবা-মাও অপরাধীর ফাঁসি ততা মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেছেন। নির্যাতিতার বাবা-মা’র পক্ষে যেসব আইনজীবী আদালতে লাগাতার আইনি লড়াই করছেন, তাঁরাও চান না অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড। কারণ এ মামলার নতুন করে তদন্ত হলে (যার সম্ভাবনা প্রবল) শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধীর সাক্ষীর বয়ান কাজে লাগবে নিশ্চিত। তাই তাঁকে ‘সরিয়ে দেওয়া’র অপচেষ্টা থেকে আপাতত বিরত থাকাটাই শ্রেয়। কারণ আরজি কর কাণ্ডে অপরাধী একজন নয়, আরও অনেকেই এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

যাঁরা অপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেছেন, তাঁদের নিয়ে রাজ্যের শাসকদলের কেউ কেউ বিরূপ মন্তব্য করতেও পিছপা হননি। নানাবিধ অরুচিকর মন্তব্য সহ নির্যাতিতার বাবা-মা’র বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি এবং ‘রাজনীতি করা’র গুরুতর অভিযোগ করে চলেছেন, যা রাজনীতি নির্বিশেষে যে কোনও সুস্থ বিবেকবান মানুষের রুচিতে বাধে। কিন্তু সমালোচনাকারীরা বেপরোয়া। তাঁরা সেসবে কোনওরকম গুরুত্ব বা পাত্তা দিতে নিতান্তই নারাজ। জানি না, আজকের লক্ষ্যভ্রষ্ট রাজনীতি কোন পথে?

উল্লেখ্য, রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে অর্থাৎ অপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের জোরালো দাবিতে ইতিমধ্যেই কলকাতা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে। এবার আবেদনকারীদের আবেদনের ভিত্তিতে নতুন করে শুনানি শুরু হবে এবং কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা আগামীদিনই হয়তো বলতে পারবে। এরপর উচ্চ আদালতের ডিভিশন বেঞ্চ থেকে শীর্ষ আদালত তো আছেই। আইন-আদালতের জটিল ও দীর্ঘসূত্রতা পেরিয়ে অপরাধীর সংখ্যা বাড়ে কিনা, তা দেখার বিষয়। এবং পরবর্তীকালে প্রকৃত অপরাধীর শাস্তিবিধান লঘু কী গুরু, কী হয়, তা অবশ্যই এখনই বলা মুশকিল। সবটাই কিন্তু অনিশ্চিত। আর কবে এর সমাপ্তি ঘটবে, তাও বলা কঠিন। কারণ এদেশে ‘বিচারের বাণী শুধু নীরবে-নিভৃতে কাঁদে’ না, সময়ের সুদীর্ঘ সরণি ধরে ‘ছোট্ট ছোট্ট পায়ে’ চলে। কোথায় এর শেষ তা বোধহয় কেউ জানেন না। একমাত্র বিলম্বিত ধৈর্যই এখানে প্রথম এবং শেষকথা! এর আগে-পরে কিছু নেই। এই ট্র্যাডিশন আজও সমানে চলেছে। এর কোনও ব্যাত্যয়ই ঘটেনি একথা বলাই বাহুল্য।

আরজি কর কাণ্ডের শুরুতে রাজ্য পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব ‘গুরুতর অভিযোগ’ উঠেছিল, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে তদন্তের ভার যাওয়ার পরও অভিযোগের বহর কিন্তু কমেনি। বরং তা আরও বেড়েছে। বার বার সিবিআইয়ের বিরুদ্ধে গাফিলতি বা গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে; এমনকি, চূড়ান্ত গাফিলতির অভিযোগও! মাননীয় বিচারকও আদালত কক্ষে প্রকাশ্যে ভর্ৎসনা করেছেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের। এসবই আমাদের সবারই প্রায় জানা।

অথচ অবাক কাণ্ড, প্রতিদিনই তাঁরা সংবাদমাধ্যমে এমন সব ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ’-এর কথা বলেছেন, যাতে অনেকেরই মনে হয়েছে শুধু ধর্ষক ও খুনি হিসেবে অভিযুক্ত সঞ্জয় রাই-ই নয়, অপর দুই অভিযুক্ত আরজি কর-এর মেডিকেল সুপার সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক অভিজিৎ মণ্ডলও কড়া শাস্তির আওতায় পড়তে চলেছেন। তাদের ‘ফাঁসি হওয়াটাও নাকি সময়ের অপেক্ষা মাত্র’, এমন কঠিন আওয়াজও উঠেছিল বৈকি। এবং অনেকে তা নিয়ে একে অন্যকে বলাবলিও করছেন।

যদিও সময়মতো (তিন মাসের মধ্যে) চার্জশিট না দেওয়ার জন্য বিচারাধীন ওই দু’জনেরই জামিন মঞ্জুর করেছেন মাননীয় বিচারক। আরজি কর কাণ্ডে অভিযুক্ত মেডিকেল সুপার সন্দীপ ঘোষ অবশ্য অন্য মামলায় (দুর্নীতি সংক্রান্ত) ছাড় পাননি; তাই এখনও সংশোধনাগারে আছেন। কবে ছাড়া পাবেন জানা নেই। সম্প্রতি জানা গেছে, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের আবেদনের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার ওই দুই সরকারি আধিকারিকের বিরুদ্ধে মহামান্য আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়ার ‘ছাড়পত্র’ দিয়েছেন।

মহামান্য নিম্ন আদালতের প্রতি যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা নিয়েই অনেকে বলাবলি করছেন, এটি একটি ‘অসম্পূর্ণ বিচার’। কেন ‘অসম্পূর্ণ বিচার?’ আসলে মাননীয় বিচারকও অসহায়। কারণ তদন্তকারীদের তরফে তাঁর সামনে এমন কোনও ‘হার্ড এভিডেন্স’ পেশ করা হয়নি, যার ভিত্তিতে তিনি অপরাধীর বিরুদ্ধে ‘কড়া শাস্তি’ বিধানে আইনিপথে এগোতে পারেন। নিন্দুকেরা হয়তো বলবেন, এসব আসলে ‘গট-আপ’ ব্যাপার। কেন্দ্র-রাজ্যের যে ‘গট-আপ’ কাণ্ড নিয়ে রাজ্যের সর্বত্র অনেকেই সরব। তাই ‘ওপর মহলের সেটিং তত্ত্ব’ও পুনরায় সামনে এনেছেন অনেকেই। এবং তা অনেকটা গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে। সাধারণ থেকে অসাধারণ—সবার মুখেই একই প্রশ্ন আর একরাশ সংশয়। যার কোনও উত্তর কিংবা সদুত্তর মেলে না। ফলে অনেকেই বিভ্রান্ত। যদিও এদেশের আইনি লড়াই কিংবা শাস্তি বিধান নিয়ে যাদের সামান্যতম অভিজ্ঞতা, তাঁরা জানেন যে, এর আগের এতদসংক্রান্ত মামলাগুলির পরিণতি কী হয়েছে! সুতরাং আরজি কর কাণ্ডের আইনি লড়াই নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই একথা বলাই বাহুল্য।

অনেকেই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেছেন এবং এখনও করে চলেছেন, নিজেদের স্বার্থেই দুই বিপরীতমুখী রাজনীতির মেলবন্ধন ঘটি এসব করা হয়েছে। আজকের ভোট-সর্বস্ব রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে করা যায় না— এমন কিছু নেই! মুখে যতই শত্রু চিহ্নিত করে ‘কড়া বিরোধিতা’ এবং গালাগাল দেওয়া হোক না কেন! তা না হলে কেন্দ্রের তদন্তসংস্থা সিবিআই শেষ পর্যন্ত রাজ্য পুলিশের অপরাধী শনাক্তকরণকেই সিলমোহর দেয়! পাঁচ মাস ধরে তাঁরা কী করলেন? শুধু শুধু সময় নষ্ট ছাড়া!

সাধারণ মানুষও যেখানে মনে করছেন, একা সঞ্জয় রাইয়ের পক্ষে এ কাজ কখনওই সম্ভব নয়, সেদিন আরও অনেকেই যুক্ত ছিল সরকারি হাসপাতাল কম্পাউন্ডে সংঘটিত পড়ুয়া-চিকিৎসকের নৃশংস ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায়। তাঁদের প্রশ্ন, ওই অপরাধীরা কি আদৌ শাস্তির আওতায় আসবে? নাকি একা সঞ্জয় রাই-ই আজীবন সংশোধনাগারে কাটাবেন? যদিও এই প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের কোনও যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর মেলে না। হয়তো ভবিষ্যতেও কোনওদিনও মিলবে না। সত্যি সেলুকাস! কি বিচিত্র দেশ এই ভারতবর্ষ!