আমরা প্রায় সবাই জানি যে অমৃতকুম্ভ থেকে চার ফোঁটা অমৃত উছলে যে চার জায়গাতে পড়েছিল, সেগুলি হল— প্রয়াগরাজ (সাবেক এলাহাবাদ), হরিদ্বার, নাসিক এবং উজ্জয়িনী। সেই কারণে বহু কাল ধরে প্রতি ৪ বছর অন্তর এই ৪টি জায়গাতে অনুষ্ঠিত হয় ভারত তথা বিশ্বের বৃহত্তম কুম্ভমেলা। শুধু তা-ই নয়, প্রতি ১২ বছর অন্তর আসে পূর্ণকুম্ভ। আর এই রকম ১১টি পূর্ণকুম্ভ পার হয়ে ১৪৪ বছর পর আসে মহাকুম্ভ (১২ নম্বর পূর্ণকুম্ভ) বা ত্রিবেণী যোগ। এই যোগে, বিশেষ করে মৌনী অমাবস্যায় গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর ত্রিবেণী সঙ্গমে স্নান অগণিত মানুষের অন্যতম মনোবাসনা। সেই কারণে এই বছর প্রয়াগরাজে অনুষ্ঠিত মহাকুম্ভ মেলার প্রচারবার্তা শুরু হয়েছিল অনেক দিন আগেই। যদিও বলে রাখা ভালো যে কুম্ভ মেলার যে ওয়েবসাইট, তাতেই স্পষ্ট করে লেখা আছে যে এই মেলাটি মহাকুম্ভ নয়,এটি সাধারণ কুম্ভ। কিন্তু প্রচারে কি না হয়, তাই কুম্ভ হয়েছে মহা কুম্ভ। অবশ্য এ বার ধর্মীয়, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক মেলবন্ধন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে মহাকুম্ভের এই ত্রিবেণী সঙ্গমে, যেটা হিন্দুদের মহাসঙ্গমও বটে।
এই মেলাকে কেন্দ্র করে উত্তরপ্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের পক্ষে সমগ্র হিন্দুসমাজের নেতা বা মুখ হয়ে ওঠার সমস্ত উপকরণই মজুত ছিল এবং তিনি সেইমতো প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে মহাকুম্ভের পরিকাঠামোর জন্য প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ইতিমধ্যেই বিনিয়োগ করেছে উত্তরপ্রদেশ সরকার এবং মেলার ৪৫ দিনে আনুমানিক ২ লক্ষ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা করা হয়েছে। কিন্তু এই বহুল প্রচারিত মহাকুম্ভ মেলা, উত্তরপ্রদেশ সরকার কর্তৃক যার ‘ডিজিটাল মেলা’ নামকরণ করা হয়েছে বিশ্ববাসীর কাছে, সেখানে গত ২৯ জানুয়ারির মৌনী অমাবস্যাতে দ্বিতীয় শাহি স্নান উপলক্ষে জমায়েতে কয়েক কোটি মানুষের প্রচণ্ড ভিড়ের চাপে ব্যারিকেড ভেঙে পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হলেন কমপক্ষে ৩০ জন (সরকারি মতে) পুণ্যার্থী। যদিও উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ সরকারের তরফে প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির পরিবারকে এককালীন ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু দুর্ঘটনার পরেও উত্তরপ্রদেশ সরকারের তরফ থেকে দুর্ঘটনায় মৃত এবং আহতদের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। উপরন্তু, বেসরকারি ভাবে এই খবরও উঠে আসছে যে, ওই দুর্ঘটনাস্থল থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে আরও দু’টি দুর্ঘটনার ফলে কমপক্ষে ১২ জনের মৃত্যু হয়। লক্ষণীয় যে, এই শেষোক্ত দুর্ঘটনাগুলি নিয়ে এই সরকারের পক্ষ থেকে একটি শব্দও এখনও পর্যন্ত উচ্চারিত হয়নি। এর উপর আছে ময়নাতদন্ত এবং মৃত্যুর শংসাপত্র মৃতদেহগুলির পরিবারের হাতে তুলে না দেওয়ার মতো অদ্ভুত সব কাণ্ড। ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর উত্তরপ্রদেশ প্রশাসন যে মেলা সংক্রান্ত পাঁচটি সিদ্ধান্ত নেয়, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রয়াগরাজে কোনও গাড়ি না ঢোকার নির্দেশ।এই সিদ্ধান্ত অনেকটা মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলার মত, এই অদ্ভুত সিদ্ধান্তের ফলে শুধুমাত্র যে প্রয়াগরাজে স্থানীয় বাসিন্দারাই প্রচণ্ড কষ্ট সহ্য করে দিন কাটাতে হয়েছে তা-ই নয়, নিকটবর্তী তীর্থক্ষেত্র বারাণসীতেও অত্যন্ত অব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সেখানেও হোটেলে কোনও ঘর ফাঁকা ছিল না, প্রচণ্ড যানজটের ফলে পথে বেরিয়ে প্রচুর সময় নষ্ট হয়েছে, জিনিসপত্র এবং গাড়িভাড়া অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, স্টেশনে জনসমুদ্র, দিল্লি স্টেশনে মানুষ পদপিষ্ট হলেন, ট্রেনগুলিতেও পা রাখার জায়গা ছিল না। এসবের দায় বা দায়িত্ব কাদের ছিল সেই প্রশ্ন অবান্তর।
জাগতিক নিয়মমতো কুম্ভ মেলা আবার আসবে, চলেও যাবে। আমরাও এই দুর্ঘটনার কথা ভুলে যাব। মৃত মানুষদের স্থান হবে ইতিহাসের পাতায়— সংখ্যায়! ধর্মীয় আবেগহেতু বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানের জমায়েত বন্ধ করা অসম্ভব। অথচ, বেশির ভাগ ধর্মস্থানের পথের দুর্গমতা হেতু যাত্রাপথ মসৃণ নয়। তার উপর বিশেষত হিন্দুবাদীদের স্বর্গ বা নরকবাসের তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনও পুণ্যস্থানে মন্দির দর্শন এবং গঙ্গায় (এখানে ত্রিবেণী সঙ্গমে) অবগাহন করা পুণ্যার্জনের লক্ষ্যে প্রধান পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই ছোটখাটো ধর্মীয় জমায়েতে ভারতের সর্বত্র এ ধরনের দুর্ঘটনার নজির বিরল নয়। তার প্রধান কারণ এমন বিপুল জনসমাগমকে সুনিয়ন্ত্রিত ভাবে পুণ্যার্জনের সুযোগ করে দেওয়ার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি। অবশ্যই দক্ষিণ ভারতের কিছু মন্দিরে (উল্লেখ্য তিরুপতি) যেখানে স্থায়ী প্রশাসনিক পরিকাঠামো আছে, সেখানে ভিড় নিয়ন্ত্রণ সুচারু ভাবে হয়ে থাকে। প্রয়াগরাজ ফেরত তীর্থযাত্রীদের একটাই বক্তব্য যে, জনসমাগমের হিসাব অনুযায়ী পরিবহণ ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের থাকার ব্যবস্থা এবং আনুষঙ্গিক দিন গুজরানের সাময়িক ব্যবস্থাপনা করতে অগ্রিম চিন্তাভাবনায় যথেষ্ট গলদ ছিল। ত্রিবেণী এবং সংলগ্ন এলাকার পূতিগন্ধময় পরিবেশ জনস্বাস্থ্যর পক্ষে ক্ষতিকারক ছিল। পরিবেশবান্ধব শৌচাগার তৈরির প্রচেষ্টা করা হয়েছিল কি না, তাও অজানা। যেখানে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষজন আসছেন, সেখানে অন্য রাজ্যগুলির সঙ্গে সমন্বয়ের যথেষ্ট অভাব ছিল। যে মেলাতে কোটি কোটি মানুষের সমাবেশ, এবং পুণ্যার্জনই অভীষ্ট, সেখানে তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল্য দিতে হবে এক বিষাদময় পরিস্থিতিতে, তা বোধ করি কাম্য ছিল না। আশা করা যায় মেলার সংশ্লিষ্ট আয়োজক রাজ্য এ বিষয়ে আগামী দিনে অগ্রিম চিন্তাভাবনা করবে।অতীতকাল থেকে চলে আসা কুম্ভমেলায় মৃত্যু-মিছিল যেন কিছুতেই থামছে না। কুম্ভমেলায় পূর্বের একাধিক বার মৃত্যুমিছিল দেখেও কি বর্তমান উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের ঘুম ভাঙেনি বা কিছুই শিক্ষা হয়নি? পুণ্যার্থীদের ভিড় যে উপচে পড়বে— তা তো জানাই ছিল। সেই মোতাবেক প্রশাসন ব্যবস্থা করলে এত মানুষকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হত না। এই মৃত্যুমিছিল যে উত্তরপ্রদেশ সরকারের চরম গাফিলতির পরিণতি— তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
প্রয়াগ সংলগ্ন ঘাটের দিকে তাকিয়ে, বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের পশ্চিমে ঢলে পড়া আর তাতে সিলুয়েট হয়ে আসা মাথায় বোঁচকা বুঁচকি নিয়ে নিরন্তর অব্যক্ত দৃষ্টিতে এগিয়ে চলা ভারতবর্ষের ছবি আমরা অনেক দেখেছি। পরিতাপের বিষয়, এর মধ্যেও রাজনৈতিক পাথেয় খুঁটে খাওয়ার মতো করে খুঁজে চলেছে নানা শক্তি। তাদের এই অভিপ্রায়ের লয় হোক, এ আমাদের আন্তরিক প্রার্থনা।তবেই নতুন ভারতবর্ষের অভ্যুদয় সম্ভব। একটি দেশের জনসমষ্টির প্রায় অর্ধেক উপস্থিত একটি নগরে,কিসের আকর্ষণে, কী মোক্ষলাভের আশায়? সন্ন্যাসী থেকে শুরু করে হতদরিদ্র ও দেশের তাবড় ভিআইপি তথা রাজনৈতিক নেতা নেত্রী, শিল্পে, শিক্ষায়,ব্যবসায় যাঁরা অগ্রণী তাঁরা সকলে ছুটে এলেন— অমরত্ব যে মিলবে না সেটা জেনেও? অমরত্বের আশা ত্যাগের পর পরে থাকছে পাপস্খলনের আশা। সত্যিই কি এই সময়পর্বে বা দিন বিশেষে হাড় হিম করা ঠান্ডায়,কোনও বিশেষ মুহূর্তে একটি ডুব দিলেই যাবতীয় পাপ ধুয়ে যাবে? যদি একটি ডুব দিলে মানুষের চৈতন্য উদয় হয়,তবে এমন অবগাহন তাঁরা নিয়ত করে যান। আগামীতে এমন কুম্ভই হোক আমাদের ইপ্সিত,অভিপ্রেত। এত মানুষ পাপ ধুতে কুম্ভমেলায় ছুটছে। বেদ গ্রন্থে এরকম পাপ খণ্ডন করার ব্যাপার ছিল না। আবরাহামিক ধর্ম থেকে পাপী হয়ে জন্মানোর ব্যাপারটা এসেছে (অরিজিনাল সিন)। ভারতেও কোনও ভাবে ওখান থেকেই আমদানি হয়েছে এই ধারণা। গণ উন্মাদনা গড়ে তুলে সরকার যেটা করেছে তা কোন ধরণের হিন্দুরাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে দেশটাকে ভাবলেও শঙ্কা হয়। তথাকথিত ‘পাপ মুক্তি’র স্থানকে ‘বৈজ্ঞানিক যুক্তি’র অনুসন্ধানে পরিবর্তন করা ইউরোপ একসময় দেখেছিলো নবজাগরণ পর্যায়ে। সেই পথে হাঁটা ছাড়া অন্য গতি নেই। যে মুহূর্তে জানা গেল যে সঙ্গমের জল মানুষের স্নানের যোগ্য নয়, সেই মুহূর্তে রে রে করে উঠল গোটা হিন্দুত্ব ব্রিগেড। এত বড় সাহস বিজ্ঞানীদের! কুম্ভের জল নিয়ে প্রশ্ন? হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি তৎক্ষণাৎ আবিষ্কার করে ফেলল গঙ্গার জলে ব্যাকটিরিওফেজের উপস্থিতি। এই ব্যাকটেরিয়া গুলিকে গঙ্গার ‘নিরাপত্তা রক্ষী’ হিসাবে বর্ণনা করে এক বিশাল পোস্ট করলেন এক হিন্দুত্ববাদী বিজ্ঞানী। তিনি বলেন যে স্নানকারীদের দ্বারা প্রেরিত ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া সনাক্ত এবং নির্মূল করতে সক্ষম এই ব্যাকটিরিওফেজগুলি। তারা নাকি ব্যাকটেরিয়ায় অনুপ্রবেশ করে, তাদের আরএনএ হ্যাক করে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের ধ্বংস করে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে এই অণুবীক্ষণিক সত্তাগুলি সমস্ত ক্ষতিকারক জীবাণু নিরপেক্ষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিলিপি তৈরি করতে থাকে। সবই বললেন শুধু বললেন না যে এই সব কাহিনী গঙ্গার জলের স্রোত যেখানে প্রবল কেবল সেখানেই সম্ভব। ফলে হরিদ্বার পেরিয়ে আসার পর,আর গঙ্গার জল নিজেই পরিশুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
মনে পড়ে গেল সত্যজিৎ রায়ের ‘গণশত্রু’ ছবিতে ডাক্তার রূপী অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই করুন খেদোক্তি, ‘মন্দিরের চরণামৃততে জীবাণু রয়েছে, একজন ডাক্তার হিসেবে সে কথা আমি দৈনিকের পাতায় লিখতে পারব না?’ ছবিতে ডাক্তারবাবুর সপক্ষে সত্যজিৎ রায় কিছু মানুষকে দেখিয়েছিলেন, আজ তার সংখ্যাও কমছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বৈজ্ঞানিক যুক্তির পক্ষে সওয়াল করার সময় এসেছে। এ বিষয়ে লাদাকের পরিবেশ কর্মী সোনাম ওয়াংকচুকের একটি ছোট্ট পদক্ষেপ গুরুত্বপুর্ণ। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠিতে লিখেছেন যে আমরা যদি আজ গঙ্গা নদীকে রক্ষা করার কথা না ভাবি তবে আগামী মহাকুম্ভ মেলা হবে বালির নদীতে, গঙ্গার প্রবাহ বিলীন হবে মরুরাশিতে। নামেই রয়েছে কেন্দ্রের ‘নমামী গঙ্গে’ প্রকল্প। গঙ্গা দূষণের কোনও সীমা পরিসীমা নেই। নদীর বুকে মেলার বেসাতি করে যে বিপুল অর্থ উপার্জন করল উত্তর প্রদেশের সরকার, তার কানাকরিও কি জুটবে গঙ্গা দূষণ রোধে, মনে হয় না।