আবার রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি জানালেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এর সঙ্গে তাঁর সওয়াল রাষ্ট্রপতির শাসন ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে সুষ্ঠু ভোট হওয়া সম্ভব নয়। বিরোধী নেতা দাবি জানাতেই পারেন, তিনি চাইলেই তো এই শাসন জারি হবে না। ২০২৬ সালে বিধানসভার ভোট এখনও কড়া নাড়তে অনেক দেরি, তা সত্ত্বেও ৩৫৬ ধারা জারির কথা তার মুখে। শাসক দল তৃণমূলের এক নেতা তাই মন্তব্য করলেন এটা ‘পাগলের প্রলাপ।’ দিশাহীন হয়ে পরাজয়ের ভয়ে বিরোধী দলনেতার এই দাবি।
ঠিক এমনি রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি বিজেপি জানিয়েছিল ২০১৯ এর বিধানসভার নির্বাচনের আগে এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের প্রাককালে। গত বিধানসভা ভোটের আগে রাজ্য বিজেপি নেতারা এমন ঘনঘন ৩৬৫ ধারা জারির আবেদন জানিয়েছিলেন যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই দাবির কোনও যৌক্তিকতা নেই ভেবে রাজ্যে এসে জানিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসনের কোনও সম্ভাবনা নেই। এই নির্বাচনে বিজেপি তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করা নিয়ে নিশ্চিত ছিল। অন্তরালে মন্ত্রিসভা গঠনও হয়ে গিয়েছিল— কিন্তু বিধির বিধান খণ্ডনের নয়। তাই নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর দেখা গেল বিজেপির ঝুলিতে মাত্র ৭৭ আসন। রাজ্য বিজেপি এখন দল যে ৭৭ জন বিধায়কও ধরে রাখতে পারল না। বেশ কয়েকজন দেশ সেবার স্বার্থে তৃণমূল নেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্য শাসনে মুগ্ধ হয়ে তৃণমূলে যোগ দিলেন। এখন বিধানসভায় বিজেপি বিধায়কের সংখ্যা প্রায় ৫৯ এসে নেমেছে।
সম্প্রতি উত্তর চব্বিশ পরগনার বারুইপুরে বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্রে রোড শো’তে এসে বিরোধী দলনেতা রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি তুললেন। তিনি ছাব্বিশের নির্বাচনে ক্ষমতা দখলের কথা না বলে ঘোষণা করলেন এই নির্বাচনে তার দল ১৮০ আসন পাবে। ২৯৪ আসন বিশিষ্ট বিধানসভায় ‘ম্যাজিক ফিগার’ হল ১৪৮। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই ঘোষণা করে দিয়েছেন আগামী বিধানসভার নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস দুই তৃতীয়াংশ আসন লাভ করে চতুর্থ বারের জন্য রাজ্যের শাসনভার হাতে নেবে। কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতারা বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন থেকেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনে দলকে তৈরি করার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বিজেপি নেতাদের বলেছেন আবার একটি সুনামি আসছে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখলের। সুতরাং এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী যিনি দলের ভোটের কৌশল নির্ধারন করবেন, তিনি রাজ্যে আসছেন দলের নেতাদের উজ্জীবিত করতে। তিনিও নিশ্চিন্ত পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূলের যে পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি ও অপশাসন চলছে, তার অবসান ঘটবে বঙ্গ বিজেপি ছাব্বিশে নির্বাচনে ক্ষমতায় আসবে। কংগ্রেস ও বামেরা এখনও তাদের ভোটের রণনীতি ঘোষণা তো দূর কে কত আসনে লড়বে তাও জানা যায়নি। তবে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধি ঘোষণা করেছেন রাজ্য কংগ্রেসের তৃণমূলের সঙ্গে লড়তে কোনও বাধা নেই। তিনি, তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধি এবং কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে পশ্চিমবঙ্গে দফায় দফায় যাবেন ভোটের প্রচার কাজে। সিপিএম তার সহযোগী বাম দলগুলির সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করে নির্বাচনে ভরসা নেবে। কিন্তু আসন ভাগাভাগির কথা এখনও ওঠেনি।
কিন্তু যে বিষয়টি রাজনৈতিক মহলকে অবাক করেছে তা হল ছাব্বিশের নির্বাচনের এখনও এক বছরের বেশি সময় বাকি। কিন্তু এখন থেকেই রাজ্য রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচন নিয়ে যেভাবে লাফালাফি শুরু করেছে, বাকি মাসগুলিতে তারা কী করবে। রাজ্যের সাধারণ মানুষও তো আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে ভাবছে বলে মনে হয় না। তবে স্বচ্ছ ভোটার তালিকা যাতে তৈরি হয় এবং তালিকা থেকে ভুয়ো ভোটাররা বাদ পড়ে, তার দাবি সব দলই জানিয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। তৃণমূলের নেতা কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকায় তাদের নাম সঠিক ভাবে আছে কিনা তা যাচাই করে দেখছেন। ধরা পড়বে অনেক ভুয়ো ভোটারের এবং মৃত ব্যক্তির নাম। স্বচ্ছ তথা নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করা নির্বাচন কমিশনের দায় দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। রাজ্যে মুখ্য নির্বাচনী অফিসারেরা এই ভোটার তালিকা তৈরি, সংশোধন, ও সংযোজন করে রাজ্য প্রশাসনের নীচু স্তরের আধিকারিকদের সাহায্যে। তবে যতই চেষ্টা হোক, নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করার কাজটি অত্যন্ত কঠিন।
রাজ্যে বিজেপি হল প্রধান বিরোধী দল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তার দলের রাজ্য নেতাদের পশ্চিমবঙ্গের আগামী বিধানসভা নির্বাচনে এখন থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিলেও—এই দলের রাজ্য নেতাদের মধ্যে সমন্বয় এবং ঐক্যের অভাব। দলের কোনও স্থায়ী সভাপতি নেই—যিনি এখন এই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি আবার সাংসদ। তার পক্ষে দলের উত্থানে এবং সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে পূর্ণ সময় দেওয়া সম্ভব নয়।
তবে জানা যায় শিগগিরই রাজ্য বিজেপির পুরো সময়ের জন্য সভাপতি নির্বাচিত হবে। তিনি কে তার নাম নিয়ে নানা কথা শোনা যাচ্ছে। তবে দলের নেতাদের মধ্যে একতার অভাব হলেও, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে বেশ সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। তিনি নানা কথায়, নান মন্তব্যে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে চাপের মধ্যে রেখেছেন। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে তার ভূমিকাও প্রশংসিত। সুতরাং বিজেপিকে দাঁড়াতে হলে রাজ্যের মানুষের কাছে যেতে হবে, তাদের অভাব অভিযোগের কথা শুনতে হবে। তবে তো মানুষের সমর্থন লাভ করা যাবে।