• facebook
  • twitter
Sunday, 6 April, 2025

সন্ন্যাসীর পদ্মশ্রী পাওয়ায় তীব্র বিতর্ক

তাঁর পরিচিতি সেভাবে বাংলার মানুষ জানতে পারেনি।

ফাইল চিত্র

পাঠক মিত্র

এ বছর পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হলেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের এক সন্ন্যাসী। তাঁর পুরস্কার পাওয়া নিয়ে বাংলায় রাজনৈতিক চর্চা এক অন্যমাত্রা পেয়েছে। আসলে বাংলায় বিজেপি ছাড়া অন্য সব দলই এই সন্ন্যাসীর পদ্মশ্রী পুরস্কার নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলের কটাক্ষ শুধুই তাদের রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্যই, তা কিন্তু একেবারেই বলা যায় না। কারণ এই সন্ন্যাসী গত অষ্টাদশ লোকসভার ভোটে বিজেপির হয়ে প্রচার করেছিলেন বলে অভিযোগ ছিল। তাই স্বভাবতই কথা উঠবেই যে বিজেপির ভোট প্রচারের পুরস্কার হিসেবে সন্ন্যাসী পেলেন পদ্মশ্রী। তবে ভোট প্রচারে সন্ন্যাসীর অংশগ্রহণের কথা এই প্রথম তা কিন্তু নয়। প্রাক স্বাধীনতাকালে আঞ্চলিক ভোট ময়দানে বিজেপির পূর্বসূরী হিন্দু মহাসভার হয়ে সন্ন্যাসীরা ভোট ভিক্ষা করেছে। সে সম্পর্কে নেতাজি বলেছিলেন, “হিন্দু মহাসভা ভোট ভিক্ষা করতে হাতে ত্রিশূল নিয়ে সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসীনি পাঠিয়েছে। হিন্দুরা ত্রিশূল এবং জাফরান পোশাক দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নত করে। হিন্দু মহাসভা ধর্মের ফায়দা নিয়ে রাজনীতিতে ঢুকে অপবিত্র করেছে। প্রত্যেক হিন্দুর উচিত তাদের নিন্দা করা।” নেতাজির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা এই কয়েকটি লাইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর জীবন সংগ্রাম সেই শিক্ষাই দিয়েছে। কিন্তু আজকের ভোট রাজনীতির কেউই নেতাজির কথা মনে রাখেনি। তবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিষয়ে বিজেপির খোলাখুলি চরিত্র থাকে বলেই তাকে চেনা যায় অতি সহজে। কিন্তু যারা ধর্ম নিরপেক্ষতার মুখোশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বাঁচিয়ে রাখতে চায় তাদের সহজে চিনতে পারে না মানুষ। আর সেটাই বিপজ্জনক হয়ে পড়ে বেশি। এ যেন পানকৌড়ি ডুবে মাছ খায় আর মাছরাঙার দোষ হয়।

যাই হোক স্বাধীন দেশের এক হিন্দু সন্ন্যাসী পদ্মশ্রী পুরস্কার পেলেন। কি কারণে তাঁর এই পুরস্কার প্রাপ্তি ? মানুষের কল্যাণমূলক কাজের পুরস্কার হিসেবে তাঁর এই প্রাপ্তি। সন্ন্যাসীর প্রতিষ্ঠান ভারত সেবাশ্রম সংঘ কল্যাণমূলক কাজের জন্য তাঁরা নিবেদিত। যে কোন বিপর্যয়ে তাঁরাই সবার আগেই ত্রাণ পৌঁছে দেয় মানুষের কাছে, এ নিয়ে দ্বিমত নেই। মানুষের চিকিৎসা সেবায় তাদের নিজস্ব হাসপাতাল আছে। কিন্তু এই সন্ন্যাসী আলাদাভাবে মানুষের জন্য কি কাজ করলেন, কিংবা ভারত সেবাশ্রম সংঘকে আরো কিভাবে এগিয়ে নিয়ে গেলেন, তা নিয়ে চর্চা হতেই পারে। তাঁর মৌলিক কল্যাণমূলক কাজ যদি থাকে তা নিয়ে কোন চর্চা এখনো দেখা যায়নি। কল্যাণমূলক কাজের জন্য এই সন্ন্যাসী পদ্মশ্রী পেলেন বলে আজকের যে চর্চা হচ্ছে, অথচ এই বাংলা তথা দেশের হয়ে একদিন এক সন্ন্যাসীনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি মাদার টেরেজা। ১৯৭৯ সালে দারিদ্র দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের জন্য তাঁর গৃহীত কাজের নিরিখে তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। সেদিন শুধু কলকাতা ধন্য হয়নি, ধন্য হয়েছিল বাংলা তথা দেশ। পরের বছরই তাঁকে মানবিক কাজের জন্য দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার ‘ভারতরত্ন’ দেওয়া হয়েছিল। সেদিন মাদার টেরেজাকে নিয়ে কোন বিরূপ সমালোচনা দেখা যায়নি। আসলে মাদার টেরেজা তাঁর মানবিক কাজের জন্য পুরস্কার পাওয়ার অনেক আগে থেকেই মানুষের কাছে পরিচিত। মাদার টেরেজা নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিলেন যেখানে কখনো রাজনীতি স্পর্শের কোন প্রশ্ন ওঠেনি। কাজের পরিচিত নিয়েই তাঁর পুরস্কার একটা যেন স্বাভাবিক নিয়মের মধ্যেই পড়ে গিয়েছিল। মাদার টেরিজার পুরস্কার প্রাপ্তি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক চর্চা হয়ে ওঠেনি।

‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কার প্রাপ্তি নিয়ে ভারত সেবাশ্রম সংঘের সন্ন্যাসীকে নিয়ে রাজনৈতিক চর্চা ভোটকেন্দ্রিক হলেও একটা কথা পরিষ্কার যে এই সন্ন্যাসী ভারত সেবাশ্রম সংঘের কল্যাণমূলক কাজের নতুন ধারা কি এমন করলেন যা তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর কর্মের পৃথক সত্তা দাবি করতে পারে যা তাঁর প্রতিষ্ঠান বা সংঘের কাছে এক ইতিহাস তৈরি করেছে। এটা জানা যায়নি। একটা কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক কল্যাণমূলক কাজের বিশিষ্ট সেবক হিসেবে তাঁর এই পুরস্কার প্রাপ্তি হলে বলার কিছু থাকে না। কিন্তু তাঁর পরিচিতি সেভাবে বাংলার মানুষ জানতে পারেনি। ভোট ময়দানের চর্চা থেকে তাঁর নাম উঠে এসেছে। উঠে এসেছে হিন্দু ধর্মীয় কট্টর কথোপকথনে। এমনভাবে এক সন্ন্যাসীর পরিচয়ে যখন সন্ন্যাসী রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত হন তখন সেই সন্ন্যাসীর চর্চা রাজনৈতিক বহির্ভূত হতে পারে না।

রাষ্ট্রের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক থাকলে রাষ্ট্রীয় সম্মানে রাজনীতি নিরপেক্ষতা থাকবে কেন ? আবার রাষ্ট্রধর্মে ধর্ম নিরপেক্ষতা না থেকে যদি ধর্ম রাষ্ট্রের পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা থাকে, সেখানে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রসঙ্গে ধর্ম প্রসঙ্গ আসতে পারে না ? রাষ্ট্রের রাজনীতিতে ভোট আর ভোট রাজনীতিতে ধর্ম নিয়ে আজকের রাষ্ট্রের দেহ সবল হতে চাইছে। বিজেপি ও আর এস এস-এর বর্ষীয়ান নেতা লালকৃষ্ণ আদবানীকে ‘ভারতরত্ন’ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, পদ্মবিভূষণ দেওয়া হয়েছে এই বিজেপি আমলেই। তাঁর আজীবন রাজনৈতিক চর্চায় দেশ সমৃদ্ধ হয়েছে বলেই এই পুরস্কার। তাঁর সংগ্রামের পরিচয় রাম-রথ যাত্রায়। এই যাত্রা দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করেছে কিনা তা নিয়ে তর্ক থাকতে পারে, তবে তাঁর এই যাত্রা থেকে বিজেপি’র জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই জয়যাত্রায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে বিজেপি বিমুখ হয়ে ফিরে যেতে হয়নি। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বিজেপি থাকবে, তাঁদের রাম-রথ থাকবে আর সেই রথ যারা এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে তারা রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবে এতে নতুন কিছু নেই। নিরপেক্ষতা বজায় রাখার প্রশ্নে যদিও অন্য দলের স্মরণীয় নেতাদেরও রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করেছে। তবে বিজেপির ধর্মীয় নীতি যেখানে পরিষ্কার সেখানে ধর্মীয় সন্ন্যাসীর পুরস্কার নিয়ে হইচই নিছক বাতুলতা মাত্র।