• facebook
  • twitter
Thursday, 3 April, 2025

মৃত্যুভয় করি না

বাংলাদেশের অত্যাচারিত হয়ে যাঁরা পালিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে এসেছেন সবকিছু ফেলে, তাঁদের কানে শোনা গেল সংখ্যালঘুদের ওপর নির্মম অত্যাচারের মর্মস্পর্শী কাহিনি।

আইনজীবী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ও ইসকনের সাধু চিন্ময়কৃষ্ণ। ফাইল চিত্র

একজন সাহসী বর্ষীয়ান বাংলাদেশের আইনজীবী ’৭১-এর মুক্তিযোদ্ধা ও মানবাধিকার কর্মী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, যিনি সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের হয়ে কোর্টে সওয়াল করতে গিয়ে অনেকের কিল, ঘুষি খেয়েছেন, তিনি এখন পলতায়।

সংবাদমাধ্যমকে জানালেন, তিনি আবার দেশে (বাংলাদেশে) ফিরে যাবেন এবং আগামী ২ জানুয়ারি যখন চট্টগ্রামের আদালতে সন্ন্যাসীর বিরুদ্ধে মামলা উঠবে, তিনি তখন তাঁর হয়ে কোর্টে দাঁড়াবেন একজন আইনজীবী হিসেবে। তিনি বললেন, এ কাজে তাঁর জীবনের ঝুঁকি আছে, তবুও তিনি আইনজীবী হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করবেন। বললেন, যদি মরতে হয়, মরব— মরতে তো একদিন হবেই। এই আইনজীবীর বাড়ি চট্টগ্রামে কিন্তু তিনি বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে ঢাকায় প্র্যাকটিস করেন। তিনি ঢাকায় ফিরে গেলে তাঁর উপর আবার অত্যাচার হয় কিনা, তা নিয়ে চিন্তিত বিভিন্ন মহল।
তাঁর মুখে শোনা গেল বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে এখন আইনের শাসন নেই। চলছে নৈরাজ্য। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের ওপর অত্যাচার পীড়ন চলছে। তাঁদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে— মন্দির অপবিত্র এবং মূর্তি ভাঙা বিনা বাধায় চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূস, যিনি শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত, বাংলাদেশে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে না এনে, অশান্তি এবং হিংসাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তিনি অতীতে শান্তির জন্য কী কাজ করেছেন, যার জন্য তিনি পুরস্কৃত, জানা যাচ্ছে না। বিজয় দিবসে তাঁর মুখে ভারত বিদ্বেষের কথা— বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে ভারতের অবদানের কথা একবারের জন্যও শোনা গেল না। বিজয় দিবসে বিএনপি’র নেতারা জিগির তুললেন, তাঁরা আবার ভারতের বিরুদ্ধে লড়তে হলে লড়বেন।

রবীন্দ্রবাবু জানালেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোনও সরকারের আমলেই সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার বন্ধ হয়নি। এমনকি আওয়ামী লীগ নেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী হাসিনার আমলেও সংখ্যালঘুদের উপর পীড়ন চলেছে। সেই দেশে ভারতের সাহায্যে স্বাধীন হওয়ার পর প্রতি পদে পদে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। অত্যাচারের অনেক খবরই অজানা। সংবাদমাধ্যমও সে খবর রাখে না। আওয়ামি লিগের এক নেতা জানালেন, আমরা মার খাচ্ছি, পালিয়ে রয়েছি, আর আমাদের নেত্রী প্রাণভয়ে পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। দেশে থাকলে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর অত্যাচার তিনি ভাগ করে নিতে পারতেন। আইনজীবী রবীন্দ্র ঘোষ জানালেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, অশক্ত শরীরেও লড়ে যাবেন। জাতিসংঘেও তিনি বিষয়টি উত্থাপনের চেষ্টা করবেন।
বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকরাও তদারকি সরকারের কাজকর্মের সমালোচনা করে জানালেন, প্রধান উপদেষ্টা শান্তি-শৃঙ্খলা ফেরাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। একজন কবি প্রধান উপদেষ্টাকে বৈঠকে জানালেন তাঁর সঙ্গে সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের কথা হয়েছে। তার প্রেক্ষিতে আমার মনে হয়নি তিনি রাষ্ট্রদ্রোহের কোনও কাজ করেছেন। তাহলে তাঁর অপরাধ কী? কেন তাঁকে জামিন দেওয়া হচ্ছে না?

অনেকের মতে, শান্তির জন্য নোবেলজয়ী খান সাহেব শান্তি ফেরাতে ব্যর্থ। কারণ তিনি উগ্রপন্থী মৌলবাদী জামায়েত ইসলামী ও পাকিস্তানপন্থীদের খপ্পরে পড়ে নিজে স্বাধীনভাবে কিছু করতে পারছেন না। বিএনপি নেতারা তাঁর ওপর অনবরত চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনের জন্য। কিন্তু নির্বাচন করার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। এর ফলে এই দলের নেতারা ক্ষুব্ধ। বিএনপি নেতাদের নির্বাচনের জন্য চাপ সৃষ্টির কারণ এখন নির্বাচন হলে এই দলই জিতবে এবং নির্বাচনে বিএনপি’র সঙ্গে জামায়েত ইসলামি দলও থাকবে। বিএনপিই সরকার গঠন করবে আর বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে ইউনূস খানকে এই পদে বসাতে পারে। আওয়ামী লীগকে এখনও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি কারণ এ ব্যাপারে বিএনপি’র নেতাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিএনপি’র নেতাদের একাংশ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার বিরোধী। যদিও আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের অত্যাচারিত হয়ে যাঁরা পালিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে এসেছেন সবকিছু ফেলে, তাঁদের কানে শোনা গেল সংখ্যালঘুদের ওপর নির্মম অত্যাচারের মর্মস্পর্শী কাহিনি। বাংলাদেশে ঢাকা সহ অন্যান্য শহরে হিন্দু মহিলারা শাখা-সিঁদুর পরে ঘরেই দিনরাতের বেশির ভাগ সময় থাকছেন। থানায় গিয়ে তাঁদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করার আবেদন করলে পুলিশ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

ভারত সরকারের বিদেশ সচিব বিক্রম মিসরি সম্প্রতি ঢাকায় গিয়ে বাংলাদেশের বিদেশ সচিবের সঙ্গে বৈঠক করে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ বন্ধ করার আবেদন করেছেন। তিনি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গেও দেখা করে ভারতের উদ্বেগের কথা জানান। আশা করা গিয়েছিল, দুই দেশের বিদেশ সচিবদের বৈঠকের পর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার বন্ধ হবে। কিন্তু তা হয়নি।

ভারতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বাংলাদেশে এখন যেভাবে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার চলছে, তার কঠোর সমালোচনা করে ভারত সরকারের এ ব্যাপারে যা করণীয় তা করতে বলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশের ঘটনাবলী নিয়ে এখনও মুখ খোলেননি। তবে ইউনূস খান যখন প্রধান উপদেষ্টা হলেন, তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন।

News Hub