প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজত্বে দেশজুড়ে বাতাসের গুণমানের দ্রুত অবনতি হচ্ছে। অথচ সরকারের কোনও হেলদোল নেই। এমন কী পরিবেশ নিয়ে সঠিক কোনও নীতিও নেই। দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণের সঙ্কট মোকাবিলায় মোদী সরকারের তীব্র সমালোচনায় মুখর হয়েছে বিরোধী দলগুলি। সম্প্রতি সুইৎজারল্যান্ডের সংস্থা আইকিউএয়ারের ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড এয়ার কোয়ালিটি রিপোর্টে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশগুলির মধ্যে ভারত রয়েছে পঞ্চম স্থানে। ওই রিপোর্টে বিশ্বের ১০০টি দূষিত শহরের মধ্যে ৭৪টি শহরই ভারতের। মেঘালয়ের বাইরনিহাটের পরেই সবচেয়ে দূষিত শহর হিসাবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে খোদ রাজধানী দিল্লি। দূষণ নিয়ন্ত্রণে মোদী সরকারের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ ভয়াবহ এই সঙ্কট দূর করতে জরুরি ভিত্তিতে এই বিষয়ে নীতিগত সংস্কারেরও দাবি তুলেছে বিরোধীরা। একই সঙ্গে ২০১৫ সালে মোদী সরকার জনস্বার্থ বিরোধী যে পরিবেশ আইন চালু করেছিল, তা অবিলম্বে প্রত্যাহারেরও দাবি উঠেছে।
২০২৪ সালের জুন মাসে আন্তর্জাতিক খ্যাত ল্যানসেটের একটি গবেষণার রিপোর্ট উল্লেখ করে কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ বলেছেন, ভারতে প্রতি বছর যত জনের মৃত্যু হয়, তার মধ্যে ৭.২ শতোংশের ক্ষেত্রে বায়ুদূষণই দায়ী। এর মধ্যে দেশের দশটি শহরে বছরে ৩৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় বায়ুদূষণের কারণে। এই ভয়াবহ অবস্থা উল্লেখ করে প্রাক্তন পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রমেশ বলেছেন, দেশে স্বাভাবিক ক্ষেত্রে বায়ু মানের মাপকাঠির (এনএকিউএস) তুলনায় যে সমস্ত জেলা তা অতিক্রম করে দূষণের কবলে পড়েছে। সেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অকাল মৃত্যুর হার ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের মৃত্যুর হার প্রায় ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের (সিএসই) একটি গবেষণার রিপোর্টের কথাও উল্লেখ করেছেন জয়রাম রমেশ। তিনি বলেছেন, ওই রিপোর্টে জাতীয় নির্মল বায়ু কর্মসূচি (এনসিপি) অকার্যকর অবস্থায় পড়ে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত পাঁচ বছের ধরে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (সিপিসিবি) পরিবেশ সুরক্ষার জন্য অর্থ (ইপিসি) এবং পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ (ইসি) তহবিলের ৭৫ শতাংশেরও বেশি অর্থ, যার পরিমাণ ৬৬৫.৭৫ কোটি টাকা খরচ না করে ফেলে রেখে দিয়েছে। মোদী সরকারের এই অপদার্থতার তুমুল সমালোচনা করে জয়রাম রমেশ বলেছেন, কেন্দ্র বায়ুদূষণ জনিত মৃত্যুর কথা মানতেই চাইছে না। দূষণ কমানোর লক্ষ্যে যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে সেক্ষেত্রে এই সরকার যথাযথ অর্থ বরাদ্দ ও করেনি। যে অর্থ বরাদ্দ করেছে তাও সম্পূর্ণ খরচ করেনি। উলটে এই সংক্রান্ত তহবিলের টাকা সঠিক ক্ষেত্রে ব্যয় না করে অপব্যবহার করেছে।
জাতীয় নির্মল বায়ু কর্মসূচিতে (এনসিপি) গত বাজেটে মাত্র ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল কেন্দ্রের মোদী সরকার। এই টাকা ব্যয় করা হবে গোটা দেশের ১৩১টি শহরে দূষণ নিয়ন্ত্রণে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। একথা উল্লেখ করে, এনসিপি-তে অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করে ২৫ হাজার কোটি টাকা করার দাবি জানিয়েছে কংগ্রেস। একই সঙ্গে এসিপি-কে আইনি প্রয়োগের ক্ষমতা দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন জয়রাম রমেশ। এই ১৩১টি শহরের বাইরে দেশজুড়ে নজরদারি চালানোর দায়িত্ব এনসিপি-র হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাবও দূষণ, কলকারখানায় নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া এবং কঠিন জ্বালানি পোড়ানো সহ যে সমস্ত ক্ষেত্র থেকে দূষিত বায়ু নির্গমন হয় তার উৎসগুলির ওপর আরও সতর্ক দৃষ্টি আরোপেরও দাবি জানানো হয়েছে।
এছাড়া যে সমস্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে জ্বালানি এখনও কয়লা ব্যবহার করা হয়, সেখানে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা চালু করার পাশাপাশি চলতি বছরের মধ্যেই সমস্ত ক্ষেত্রে ফ্লু গ্যাস থেকে সালফার ডাই অক্সাইড নির্মূল করার প্রযুক্তি সম্পন্ন ইউনিট চালু করতেও কেন্দ্রের কাছে প্রস্তাব রেখেছে বিরোধী দলগুলি। জাতীয় গ্রিন ট্রাইব্যুনালের মতো পরিবেশ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয় এমন পরিবেশগত আইনও সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।