• facebook
  • twitter
Friday, 4 April, 2025

বাঙালির ভাষা

পিতামহ অর্থে ‘ঠাকুর-দাদা’, সংক্ষেপে ‘ঠাকুদ্দা’ প্রায় সব অঞ্চলে চলে। কোথাও কোথাও বলে ‘কর্তা’ (অর্থাৎ বাবার বাবা যিনি খোদ কর্তা সংসারের)।

ফাইল চিত্র

শ্রী সুকুমার সেন

পূর্ব প্রকাশিতর পর

আনুষ্ঠানিক বিবাহে বধূর নাম পিতৃবংশের খাতা থেকে কাটা যেত আর স্বামী বংশের খাতায় তা লেখা হত। সাঙ্গায় দুই পক্ষই সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন।

বাপের বাড়ির থেকে বয়ে আনা হয়েছে বলেই নাম হয়েছে সংস্কৃতে ‘বধূ’, তার থেকে বাংলায় বউ। সংস্কৃত ‘কন্যা’ মানে ছোটো মেয়ে, পরে আইবুড়ো মেয়ে। যে দু-চার দিন আগে কন্যা ছিল, এখন বিয়েলি, তাকে বলা হয় তার শ্বশুরবাড়িতে ‘ক’নে বউ’ (সংস্কৃত কন্যাবধূ থেকে)। পুরুষের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী হল ‘ভাদ্দর বউ’ (সংস্কৃত ‘ভ্রাতৃবধূ’ থেকে)।
এই খানে ‘আইবড়ো’ বা ‘আইবুড়ো’ শব্দের অর্থ ও ব্যুৎপত্তি বিচার করা যাক। কথ্য সংস্কৃতে অব্যুঢ় (মানে অবিবাহিত) শব্দের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত অ-বি-বহ্+ক্ত শব্দ থেকে।

বিবাহিত নরনারীর পরস্পর শ্বশুর ও শাশুড়ি যথাক্রমে বাংলায় ‘বেয়াই’ (সংস্কৃত ‘বৈবাহিক’ নূতন গঠিত শব্দ) ও ‘বেয়ান’ (‘বেয়াই’ থেকে ‘ইনি’ প্রত্যয় যোগে, আরও নূতন নিষ্পন্ন)।

স্ত্রীর বোন ‘শালি’ (সংস্কৃত শ্যালক)। তস্য স্ত্রী ‘শালাজ’ ‘শেলেজ’ (সংস্কৃত শ্যালক জায়া থেকে)। স্বামীর অথবা স্ত্রীর পিসি, পিসির স্বামী, মাসি ও মাসির স্বামী যথাক্রমে পিস শাশুড়ি (পিসি শাশুড়ি থেকে), পিস- শ্বশুর (পিসা শ্বশুর থেকে), মাস শাশুড়ি (মাসি শাশুড়ি থেকে) ও মাসশ্বশুর (মেসোশ্বশুর থেকে)। শালির স্বামী হল ভায়রা ভাই— (ভ্রাতৃবর ভ্রাতৃক থেকে), কোন কোন অঞ্চলে সংক্ষেপে ‘ভায়রা’। শ্বশুরের বা শাশুড়ির বাবা ‘দাদাশ্বশুর’ শ্বশুরের মা ‘দিদিশাশুড়ি’।

সংস্কৃত প্রাচীন শব্দ পিতৃ (পিতা) কেবলমাত্র ‘পিসি, পিসে’ শব্দে চিহ্ন রেখে একেবারে অন্তর্ধান করেছে প্রাকৃতের আমল থেকেই। সংস্কৃতে এই অর্থে চলিত হয়েছিল ‘তাত’ শব্দ। এ শব্দ প্রায় নিশ্চিহ্ন। অবহটঠে একটি একটি নূতন শব্দ দেখা যায়, ‘বপপ’, মূলত ছেলে ভুলোনো (nursery) শব্দ। এ শব্দটি প্রাচীন বাংলায় পাই ‘বপা’ রূপে, এখন ‘বাপ’। যেমন ‘বাপের জন্মে’, ‘বাপের বাড়ি’ ইত্যাদি। ‘বাবা’ এসেছে ফারসী থেকে, তবে তাতে ‘বাপ, বাপা’ শব্দের প্রভাব আছে। সংস্কৃত ‘মাতা’ (মাতৃ শব্দের প্রথমার এক বচন) সরাসরি চলে এসেছে, মা। ভাই এসেছে সংস্কৃত ‘ভ্রাতৃক’ (ভ্রাতৃ+ক) থেকে।

বড়ো ভাই এবং পিতার পিতা অর্থে দাদা শব্দটি আধুনিক। শব্দটি এসেছে কিছু পরিবর্তন লাভ করে ফারসি থেকে। (যেমন ফারসিতে ‘দাদ্-দিহ’, মানে ন্যায়বিচারক, ঈশ্বর, বড়ো ভাই; ‘দাদর-অন্দর’ মানে মায়ের পেটের ভাই; ‘দাদবন্ধ’ মানে বড়োভাই; ‘দাদ্’ মানে বর্ষীয়ান ব্যক্তি শিক্ষক ইত্যাদি।) বড়ো বোন এবং পিতামহী ও মাতামহী অর্থে দিদি শব্দটি ‘দাদ’ থেকেই উৎপন্ন হয়েছে আমাদের ভাষায়। পিতামহী ও মাতামহী অর্থে ‘দিদি’ শব্দটির চল আছে কোন কোন সম্প্রদায়ে ও অঞ্চলে।

পিতামহ অর্থে ‘ঠাকুর-দাদা’, সংক্ষেপে ‘ঠাকুদ্দা’ প্রায় সব অঞ্চলে চলে। কোথাও কোথাও বলে ‘কর্তা’ (অর্থাৎ বাবার বাবা যিনি খোদ কর্তা সংসারের)। তেমনি পিতামহী বলতে চলে ঠাকুরদাদার হুবহু স্ত্রীলিঙ্গরূপ ‘ঠাকরুণদিদি’ সংক্ষেপে ‘ঠানদি’ (পূর্বতন ‘ঠাকুরানী দিদি’ থেকে)। মাতামহী প্রায় সর্বত্র ‘দিদিমা’। কোন কোন অঞ্চলে লুপ্তপ্রায় আইমা শব্দ হয়ত এখন শোনা যায় মাতামহী অথবা/এবং পিতামহী অর্থে। শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘অবিমাতা’ থেকে। ষোড়শ শতাব্দীতে এবং তার পরেও পিতামহী অর্থে আইমা’র সঙ্গে তুলনা করা যায় ধাই-মা (সংস্কৃত ‘ধাত্রী মাতা’ থেকে) ইংরেজী delivery ও wet nurse এর মতো মানে। মধ্য বাংলায় delivery nurse অর্থে ‘খোলা ধাই’ (অর্থাৎ যে ধাই নাড়ী কেটে নবজাত শিশুকে গর্ভাশয় মুক্ত করে) পাওয়া যায়। ইংরেজী wet nurse-এর অর্থে অনেক অঞ্চলে ‘দুধ-মা’ শোনা যায়।

বাবার বড়ো ভাই হল জেঠা, সংস্কৃত *জ্যেষ্ঠক (অথবা জ্যেষ্ঠতাত) থেকে। জেঠার সন্তান হল ‘জেঠাতুতো’ (পূর্বতন *জেঠুতা, সংস্কৃত * জ্যেষ্ঠক পুত্রক থেকে) ভাই বা বোন।

(ক্রমশ)