• facebook
  • twitter
Thursday, 3 April, 2025

‘নারীশক্তি’ সঙ্গীত উৎসব

শুরু করেন রাগ শ্রী আধারিত আলাপ - জোড় এবং পরে দুটি গত বাঁধলেন ত্রিতালে। রাগের অপূর্ব সুরমূর্চ্ছনা ও স্বভাবসুলভ পরিচ্ছন্ন নিবেদন মুগ্ধতার সৃষ্টি করেছিল।

ফাইল চিত্র

অন্নপূর্ণা দেবী ফাউন্ডেশন বিগত চার বছর ধরে শাস্ত্রীয় সংগীতপ্রেমিক কলকাতা শহরবাসীর জন্য ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকের সংগীত উপহার দিয়েছে। আন্তরিক, সেতার ফেস্টিভ্যাল, সরোদ ফেস্টিভ্যাল, ভায়োলিন ফেস্টিভ্যাল। আর এবছর অর্থাৎ মার্চের ৭,৮,৯ এই তিন সন্ধ্যা ধরে ছিল নারী শক্তির শক্তি বিজয় উদযাপন! আট মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে পালিত হয়। বোঝাই যায় এই দিনটিকে উপলক্ষ করে তারিখ নির্বাচন করা হয়েছিল তিনদিনের ‘নারীশক্তি’ শাস্ত্রীয় সংগীত উৎসবের। প্রতি সন্ধ্যায় দুজন করে মোট ছয়জন শিল্পী গাইয়ে—বাজিয়ের সমাহার ছিল। ভিড় ছিল চোখে পড়বার মতো। বোঝা যায় যে, কলকাতা শহরবাসীও বিমুখ করেননি । অনুষ্ঠান উদ্যোক্তাদের কাছে এটা ছিল যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক।

শুরুতেই ছিল অনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। অন্নপূর্ণা দেবী ফাউন্ডেশনের পক্ষে পণ্ডিত নিত্যানন্দ হলদিপুর ও পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার পুষ্পার্ঘ অর্পণ করেন মঞ্চের দুপাশে রাখা মা অন্নপূর্ণা দেবী ও বাবা আলাউদ্দিন খাঁ এর প্রতিকৃতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করে। এরপর শুরু হয় অনুষ্ঠান। সূচনা হয় তবলা একক বাদনে। শহরবাসীর কাছে পরিচিত তরুণ ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পী রিম্পা শিব একক তবলাবাদন পর্বে ত্রিতাল আধারে একক বাজনার উপস্থাপন করেন। তার পরিবেশনে ছিল ফারুকাবাদ ঘরের রচনা উপস্থাপনা। চতুরঙ্গ, গত, গত – কায়দা ইত্যাদির তৈয়ারিতে ভালো লাগান। হারমোনিয়ামে নগমা রাখেন দেবাশিষ অধিকারী। এরপর ছিল কণ্ঠসঙ্গীত। গুরুমা বিদুষী গিরিজা দেবী ও গুরুজি পন্ডিত অরুণ ভাদুড়ীর তালিমে তৈরি সুচেতা গাঙ্গুলীর পরিবেশনা ছিল ভীষণই উপভোগ্য। শুরু করেন রাগ মারু বিহাগে দুই লয়ে দুটি বন্দিশ “রাতিয়া হামারি” ও “জাগে মোরে ভাগ” গাইলেন। ঠুংরি “তুম তো করো তো বরজোরি”, চৈতি “চৈত মাসে বোলেরে কোয়েলিয়া” আর শেষে একটি ভৈরবী “চলারে পরদেশিয়া” পরিবেশনা মুগ্ধতা আনে। সহযোগিতায় ছিলেন সৌমেন সরকার (তবলা) ও দেবাশীষ অধিকারী (হারমোনিয়াম)।

দ্বিতীয় সন্ধ্যার শুরু সরোদ বাদনে; পরিবেশন করলেন বিশিষ্ট শিল্পী দেবস্মিতা ভট্টাচার্য, যিনি তার পরিবেশনার জন্য আন্তর্জাতিক মহলে ইতিমধ্যেই সুখ্যাতি অর্জন করে ফেলেছেন। এই সন্ধ্যার জন্য নির্বাচন করেছিলেন রাগ জয়-জয়ন্তী। শুরুতে আলাপ – জোড়, লড়ন্ত, তার-পরন। পরে দুখানি গত পরিবেশন করলেন বিলম্বিত ও দ্রুত ত্রিতাল আধারে (রচনাকার তার দাদাগুরু সঙ্গীতাচার্য রাধিকামোহন মৈত্র)। তবলায় ছিলেন পন্ডিত পরিমল চক্রবর্তী। এই সন্ধ্যার অপর অংশে ছিল আগ্রা গায়নশৈলীর শিল্পী বিদুষী পূর্ণিমা ধূমালের কণ্ঠসঙ্গীত। এই ঘরের বিশেষ রাগ খেম কল্যাণ দিয়ে পরিবেশনা শুরু করেন। নোম-তোম আলাপ, তারপর বিলম্বিত (একতাল) ও পরে দ্রুত ত্রিতালে ‘সব সখীয়ন মিল কর করো শৃঙ্গার’ শোনান। পরিবেশনভঙ্গী ছিল অত্যন্ত মনোগ্রাহী। এরপর চয়ন করেছিলেন ঝুমরা তালে রাগ বাহার বন্দিশ ‘বাহার আয়ি সকল বন ফুল লায়ি’, পরে দ্রুত ত্রিতালে গাইলেন ‘আজ রঙ্গ খওয়াজা সঙ্গ খেলিয়ে ধামাল’। আনন্দদায়ক এই পর্বের সহযোগিতায় ছিলেন পন্ডিত সঞ্জয় অধিকারী (তবলা) ও বিদুষী রূপশ্রী ভট্টাচার্য (হারমোনিয়াম)।

তৃতীয় সন্ধ্যার শুরুতে ছিল সেতার উপস্থাপনা। ইমদাদখানি ঘরের প্রসিদ্ধ সেতারি অনুপমা ভাগবত ছিলেন এই সন্ধ্যার শুরুর আকর্ষণ। শুরু করেন রাগ শ্রী আধারিত আলাপ – জোড় এবং পরে দুটি গত বাঁধলেন ত্রিতালে। রাগের অপূর্ব সুরমূর্চ্ছনা ও স্বভাবসুলভ পরিচ্ছন্ন নিবেদন মুগ্ধতার সৃষ্টি করেছিল। পরে ছিল রাগ আনন্দীকল্যাণে বিলম্বিত ও দ্রুত গত (ঝাঁপতাল) পরিবেশনা। তবলায় অত্যন্ত সু-সহযোগী ছিলেন সৌমেন নন্দী। এই সন্ধ্যার তথা এই ফেস্টিভ্যালের সমাপনী লগ্নে শিল্পী ছিলেন বিদুষী অলকা দেও মারুলকার। অশীতিপর এই শিল্পী শুরুতে অনেকেরই ভ্রুকুঞ্চনের কারণ হলেও তার পরিবেশনা যেন বাকরহিত করে দেয় উপস্থিত শ্রোতা- দর্শকমন্ডলীকে! পরিবেশনার শুরু করেন রাগ বাগেশ্রী কানাড়ায় বিলম্বিত (ত্রিতাল) বন্দিশ “গোরে গোরে মুখ” (পারম্পরিক) ও পরে দ্রুত (আদ্ধা ত্রিতাল) বন্দিশ “সগুন বিচারো”। এরপর চয়ন করেছিলেন রাগ ললিত পঞ্চম (শুদ্ধ ধৈবতের প্রয়োগে) । বিলম্বিত (ঝাঁপতাল) “উড়ে বুঁদ নব খেলাত বসন্ত আবিরা” ও পরে দ্রুত (ত্রিতাল) বন্দিশ “আব তুম বহি কিউ না” (বসন্ত ও হোলির বাতাবরণে তৈরি)। শেষ করেন ভৈরবী রাগে “সাবরিয়া অব তো আজা”। বহুদিন পর্যন্ত মনে থাকার মতন এই উপস্থাপনায় সহযোগিতা করেছিলেন- সহকন্ঠে- শিবানী মারুলকার (কন্যা) ও নিনাদ দেও, বিভাস সাংঘাই (তবলা) ও রূপশ্রী ভট্টাচার্য (হারমোনিয়াম)। সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন- চন্দ্রিমা রায়।