• facebook
  • twitter
Friday, 4 April, 2025

‘আমার কাছে পারফর্মেন্সটা মেডিটেশনের মতো’

লোকগানের সোঁদা গন্ধ আর মেঠো সুরের জাদু- এটাই তাঁর গানে ধরে রাখার চেষ্টা করেন তিনি। কখনও আবার রাধা-কৃষ্ণের ভক্তি রসে নিমজ্জিত করেন শ্রোতাদের। মন খুলে এমন নানা কথা ভাগ করে নিলেন শিল্পী পৌষালী ব্যানার্জি। শুনলেন অবন্তী সিনহা।

ফাইল চিত্র

লোকসঙ্গীত শিল্পী পৌষালী ব্যানার্জির গান নিয়ে পড়াশোনা শান্তিনিকেতনের সঙ্গীতভবনে। চার বছর বয়স থেকে মায়ের কাছে গানে তাঁর হাতেখড়ি। কেরিয়ারের শুরুতে জি বাংলার সারেগামাপা ২০১৭-এর শীর্ষ ১০ জনের মধ্যে একজন হন পৌষালী। লোকগানের মাধুর্য আর তাঁর অসাধারণ পারফর্মেন্স- এই নিয়েই পৌষালী স্থান করে নিতে চান শ্রোতাদের অন্তরে। সাক্ষাৎকারে অকপট পৌষালী।

হোলি স্পেশাল আপনার এই যে নতুন গান ‘ফাগুনের কাল আইল রে’ রিলিজ হল, এটার নেপথ্যের গল্পটা একটু শুনতে চাই।
এটা রাজকুমার রায়ের একটা কম্পোজিশন, বসন্তের শুরুতেই টাইমস মিউজিক থেকে এই অফারটা এসেছিল। একটু ‘পেপি’ ধরনের কম্পোজিশন। আমি যেহেতু রাধা-কৃষ্ণের গান বা ডিভোশনাল গান বেশি গাই, সেখান থেকে অনেকটা সরে গিয়ে একটা ডান্স আইটেম সং আমি প্রথমবার গাইলাম। তবে খুব হইহই করে গানটা গেয়েছি।

লোকগান যেহেতু শিকড়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত, এর চর্চা মানুষ হিসেবে পৌষালীকে কতটা ডাউন টু আর্থ থাকতে সাহায্য করে?
বর্তমানে জনপ্রিয়তার মাপকাঠি যদিও জনতা এবং আমার কাজের নিরিখেই তা বিচার হয়- তবু বলব আমি নিজে এখনও খুব সাধারণ জীবনযাপন করি। এখনও চারবেলা ভাত খাই। খুব উচ্চাশাও নেই। আমার দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনটুকু মিটে গেলেই আমি খুশি থাকি।

সারেগামা-র ডিরেক্টর অভিজিৎ সেন যদি না আমায় আবিষ্কার করতেন এবং সুযোগ দিতেন, আমার এই জায়গাটায় পা রাখাই হয়তো হতো না। রিয়ালিটি শো-তে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর প্রাথমিকভাবে একটু চোখে ধাঁধা লেগে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আমি খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে শুরু করি এই চাকচিক্যর আসলে কোনও মূল্য নেই, নিজের কাজটাই করে যেতে হবে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের আর আমার মা বাবার শিক্ষাটাই আমার কাছে শেষ কথা। মাটিকে আঁকড়ে, মাটিতেই শুরু, মাটিতেই শেষ- এই ফিলোজফিতেই আমি বিশ্বাস করি।

আপনার শান্তিনিকেতনের দিনগুলোর কথা একটু বলুন।
আমার শৈশবে বাবার কর্মক্ষেত্রের সুবাদে থেকেছি চিত্তরঞ্জনে। বাবা-মা চাইতেন আমি গান গাই। তাই আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা দিনগুলো কেটেছে শান্তিনিকেতনে। রবীন্দ্রনাথ এবং লালন ফকিরের গান নিয়েই আমার জীবন। আমি সঙ্গীতভবনের ছাত্রী, আশ্রমে থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে পড়াশোনা করেছি। বসন্ত উৎসবের এই সময়টাতে আমরা ফুলের রেুণু দিয়ে আবির বানাতাম, আলপনা দিতাম। আমাদের বসন্ত উৎসবের মহড়া দেখার জন্য দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন। ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠে রিহার্সালে যাওয়া, রেওয়াজ করা- এই ছিল রুটিন। শাড়ির উপরেই নির্ভরশীল জীবন ছিল আমাদের। মাটি থেকে কুড়োনো ফুল লাগাতাম চুলে। ১০ মার্চ প্রতি বছর পালন হতো গান্ধীপূর্ণা। সেদিন বিশ্বভারতীর সব শিক্ষীর্থীরা মিলে, স্নানঘর, রাস্তা, ঘরদোর সব পরিষ্কার করবে এটাই ছিল নিয়ম। এখনও সেটা পালিত হয়।

লোকগানকে ভালোবাসার সূত্রপাত কবে থেকে হল?
বিশ্বভারতীতে থাকাকালীন আমার বেশ কিছু বাংলাদেশী বন্ধু হয়। তারা আমায় লোকগান শোনাত। ওই সব গানের কথাগুলো আমায় আচ্ছন্ন করে দিত। লোকে শুনলে অবাক হবে কিন্তু এটা আমার ওয়ান ফাইন মর্নিং একটা রিয়েলাইজেশন! ‘ভক্তের আধীন হও চিরদিন থাকো ভক্তের অন্তরে..’, শাহ আব্দুল করীমের এই গানটা আমার জীবনবোধ বদলে দিল। সত্যিই তো কিছু পাওয়ার নেই এই সংসারে- শুধু নিজের কাজটুকু করে যাওয়া। কোনও একটা অজানা স্টেশনে শেষ পর্যন্ত তোমায় নেমে যেতেই হবে। ‘মায়াজালে বন্দি হয়ে আর কত কাল থাকব..’, শান্তিনিকেতনে একটা ভোরে এই আত্মোপলব্ধিই আমার হয়েছিল যে, গানের কথার সঙ্গে জীবনকে মেলানো যায়।

কালিকা প্রসাদের সঙ্গে আপনার আলাপ হওয়া ও প্রভাব কীভাবে পড়েছিল?
ওঁর সাহচর্য খুব কম দিনের জন্য পেয়েছি কিন্তু প্রভাবটা রয়ে গেছে জীবনভর। সারেগামা-র অডিশন দিতে গিয়ে আলাপ। প্রথম প্রথম ভীষণ ভয় পেতাম কারণ ওঁর একটা আশ্চর্য ‘অরা’ ছিল। শুধু লোকসঙ্গীত নয়, জ্যাজ, ব্লুজ সমস্ত ধরনের গান ওঁর গুলে খাওয়া। এমন মানুষের সামনে পারফর্ম করাটাই চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমায় গান শোনাতে বললেন। আমি ‘দূরে কোথাও দূরে দূরে’ শুনিয়েছিলাম। উনি বলেছিলেন, ‘মানে বুঝিস এই গানের?’ আমি হ্যাঁ বললাম। তখন বললেন, ‘লোকগান এভাবে গাইতে পারবি, মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারবি?’ আমি আবারও হ্যাঁ বলেছিলাম। মানুষটা আজ আর নেই, ওঁর স্থান তো কেউ নিতে পারবে না। আমি ফাঁকটা একটু পূরণ করার চেষ্টা করছি মাত্র।

আধুনিক সময়ে যেভাবে ফোক গাওয়া হচ্ছে, তাতে লোকজ বাদ্যযন্ত্রগুলো ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। এটা কি শিল্পী হিসেবে আপনাকে পীড়া দেয়?
পীড়া অবশ্যই দেয় কিন্তু সেটার বহিঃপ্রকাশ ঘটাই না। কারণ ৭০-৮০ বছরের পুরনো গান আমরা যখন গাই, তখন তাকে আধুনিক শ্রোতার জন্য, তাদের মতো করেই প্রেজেন্ট করতে হয়। তবে গানের রক্ষণশীলতার দায়িত্বও এক্ষেত্রে শিল্পীরই থাকে। আমি যেমন চেষ্টা করি ইন্স্ট্রুমেন্ট এবং গানের কথা দুটোই আগের মতো করে ধরে রাখতে।

আপনি স্টেজে থাকার সময় দর্শকদের সঙ্গে প্রচুর ইন্টার‍্যাক্ট করেন। এটাই কি আপনার ইউএসপি?
লোকমুখে প্রচলিত লোকেদের নিয়ে গান, তাই মানুষকে ইনভল্ভ করেই যদি না গাইলাম, তাহলে আর লোকগান কী করে হল। তবে বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আমার কাছে পারফর্মেন্সটা হল মেডিটেশনের মতো।

একবার বাংলাদেশের মানিকগঞ্জে অনুষ্ঠান করতে গেছি, সেখানে আমায় বলা হয়েছিল রাধা-কৃষ্ণ প্রসঙ্গে কোনও গান গাওয়া যাবে না। আমি সারি গান, ঝুমুর, দেহতত্বের গান গাওয়া শুরু করি। হঠাৎ একদল শ্রোতা উঠে দাঁড়িয়ে বলেন ‘কৃষ্ণ প্রেমে পোড়া দেহ’ গানটা শুনব। আমি দু’সেকেন্ডের জন্য থমকে গিয়েছিলাম। ওঁরা বারবার অনুরোধ করায় পরপর কৃষ্ণের গান গেয়ে চলতে হয়। এটা আমি বিশ্বাস করি একটা ‘ডিভাইন কল’ ছিল। আমার ধারণা আমার ঈশ্বর পারফর্মেন্সের সময় আমার সামনে নেমে আসেন। শ্রোতাদের মধ্যে দিয়েই যেন আমার ঈশ্বর দর্শন হয়।

News Hub