রতন ভট্টাচার্য
২০২৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পেলেন দক্ষিণ কোরিয়ার লেখিকা হান কাং। তিনি গোয়াংজু শহরে জন্মগ্রহণ করেন ২৭ নভেম্বর ১৯৭০ সালে। তাঁর পিতা ঔপন্যাসিক হান সেউং-ওন। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে হান সপরিবারে গোয়াংজু ত্যাগ করে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিওলে থিতু হন। ‘গ্রিক লেসনস’ উপন্যাসে এই শহরের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর ঠিক চার মাসের মধ্যে হানের শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত শহর গোয়াংজুতে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনতা আন্দোলন শুরু করে। হানের ভাষ্যে, সে লড়াই ছিল— ‘কনফ্রন্টেশন অফ টু এক্সট্রিমিস্ট’ বা দুই চরমপন্থি দলের লড়াই। ক্ষমতার লড়াই যাদের মধ্যেই সংঘটিত হোক না কেন, তাতে আদতে প্রাণ যায় সাধারণ মানুষের। এই বিষয়টিকে উপজীব্য করে হানের লেখা তীব্র মানবিক ও আবেগি অভিঘাতসম্পন্ন। তাঁর ভাই হান ডং রিমও একজন লেখক। কাং ইয়োনসেই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোরীয় সাহিত্য নিয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রামে ভর্তি হন। হানের জন্ম ও শৈশব কাটে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়াংজু শহরে। হান কাং-এর বাবা হান সিয়ুং ওন নিজেও কোরিয়ায় একজন সমাদৃত কথাসাহিত্যিক, যিনি এখনো জীবিত।
বুকার পুরস্কার বিজয়ের পর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কন্যা হান এ কথা উল্লেখ করেছেন। সাহিত্য রচনার শিক্ষামূলক কোনো সেশন তিনি তাঁর বাবার কাছে সেভাবে কখনো পাননি। কিন্তু বাবার যে বিশাল লাইব্রেরিতে বই পরিবেষ্টিত থেকে তিনি শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন, হানের লেখক হয়ে ওঠার পিছনে সেই লাইব্রেরির অবদান অসীম। হান ১৪ বছর বয়সে সিদ্ধান্ত নেন তিনি লিখবেন। ততদিনে হান আবিষ্কার করেছিলেন, তাঁর বাবার বেশিরভাগ সাহিত্যকর্ম, বাবার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা শহর ‘জেংঘাং’-কে ঘিরে। নিজের চোখে দেখা, নিজের কানে শোনা, ব্যক্তিঅভিজ্ঞতাপ্রসূত উপলব্ধির সূত্রে যে শিল্প বা সাহিত্যের জন্ম, তা-ই মহৎ ও সত্য। সম্ভবত নিজের সাহিত্যিক বাবার ফুটপ্রিন্ট অনুসরণ করে শৈশব বা কৈশোরেই সেটা হানের অবচেতনে গেঁথে গিয়েছিল।
১৯৯৩ সালে, স্থানীয় সাহিত্যপত্রিকার পাতায় ২৩ বছর বয়সে প্রথম পাঁচটি কবিতা, পরবর্তী বছর একটি গল্প এবং তার পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাসে জীবনের ছোটখাটো অভিঘাতগুলো সঞ্চারিত হলেও হান ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছিলেন তাঁর ব্যক্তিজীবনে মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে বড় ট্রমাকে সৃজনশীল উপায়ে মোকাবিলা করার জন্য। কোরিয়ান আধুনিক কবি ই স্যাং-এর লেখা এবং দর্শন হানকে প্রভাবিত করেছিল, তাঁর প্রস্তুতির দিনগুলি থেকে। ভালোবাসা মানুষের জীবনের মুখ্য চালিকাশক্তি, নির্মম রসকষহীন পৃথিবীতে আরও একটি দিন শুরু করবার রসদ। হান দাবি করেন, তিনি বেশ পরিণত বয়সে এসে ভালোবাসার মানে খুঁজে পেয়েছেন। কথাটা শুনতে খেলো লাগে, কিন্তু এটাই সত্যি। তাঁর উপন্যাস ‘দ্য গ্রিক লেসনস’-এ দু’জন বিপরীত লিঙ্গের মানুষের খোঁজ মেলে, যাঁদের একজন কথা বলতে পারেন না, অপরজন ক্রমশ নিজের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলছেন। গ্রিক ভাষা শিখবার মাধ্যমে তাঁদের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। তাঁরা একত্রে একে অপরের যাপিত জীবনের ভীতিপ্রদ সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, মোকাবিলা করেন।
সারাজীবন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে সাহিত্যচর্চা করে, পৃথিবী কাঁপানো সাহিত্যকর্মের জন্ম দিয়েও লিও তলস্তয়, ভার্জিনিয়া উলফ, জেমস জয়েস, রবার্ট ফ্রস্ট, মিলান কুন্দেরা থেকে হালের হারুকি মুরাকামির মতো কবি-কথাসাহিত্যিকরা নোবেল পুরস্কারের জয়তিলক কপালে পরতে পারেননি। তাহলে হান কাং তাঁর তুলনামূলক হ্রস্ব সাহিত্যিক জীবনে ঠিক কী নিয়ে লিখলেন, বা মানবজীবনের কোন জটিল ও গভীর প্রশ্ন তুলে ধরলেন যে, তাঁকে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হলো না নোবেল কমিটির পক্ষে? এ ব্যাপারগুলো আমাদের ভাবায়। বারংরার তাঁর কলম স্বীকৃতি পেয়েছে বিভিন্নভাবে। নোরেল পুরস্কার আসার আগে তাঁর ২০০৭ সালে লেখা ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ প্রথম কোরীয় ভাষার উপন্যাস হিসেবে ২০১৬ সালে কথাসাহিত্যে আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার অর্জন করে। এছাড়া এটি ইংরেজি ভাষায় অনূদিত তাঁর প্রথম বইগুলোর একটি।
হান কাং-এর সাহিত্য এখনো খুব বেশি পরিমাণে অনূদিত হয়ে বাংলা ভাষার পাঠকদের হাতে পৌঁছায়নি। বাকি নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিকদের তুলনায় তিনি এখনো বেশ তরুণ। তবে ঔপনিবেশিক স্মৃতি, সহিংসতা, নারীঅভিজ্ঞতার জগৎ ইত্যাদি বিষয়বস্তুকে উপজীব্য করে ইতোমধ্যেই তিনি যে সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করেছেন, তার বিষয়বস্তু ও বুনন খুব অসাধারণ, অভূতপূর্ব কিছু নয়। খুঁজলে বিশ্বসাহিত্যে তো বটেই, আমাদের সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যেও হান কাং-এর সমমান ও বিষয়বস্তুর সাহিত্য হয়ত পাওয়া যাবে। কোরিয়ান গান, সিনেমা, টিভি সিরিজ বর্তমান বিশ্বে হটকেকের মতো বিকোচ্ছে। কোরিয়ান সংস্কৃতির এহেন রমরমার যুগে, সেই ভাষার সাহিত্যকে বিশ্বে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, এমন একজন নারী ঔপন্যাসিককে তুলে আনাও নোবেল কমিটির লক্ষ্য হয়ে থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে হানের পুরস্কার লাভের যৌক্তিকতা বিচারের ভার আমাদের সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। ‘ই সাং সাহিত্য পুরস্কার’ এল ২০১৬ সালে, ২০১৭ সালে ‘হিউম্যান অ্যাক্টস’-এর জন্য মালাপার্তে পুরস্কার, ২০২৩ সালে ‘উই ডো নট পার্ট’-এর জন্য প্রি মেদিসি, ২০২৪ সালে শিল্পকলায় হো-আম পুরস্কার আর অবশেষে ২০২৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার।
‘ঐতিহাসিক যন্ত্রণাবিদ্ধ বিষয়ের সঙ্গে মুখোমুখি করা ও মানবজীবনের ভঙ্গুরতাকে উন্মোচনকারী প্রগাঢ় কাব্যিক গদ্যের জন্য’ তিনি ২০২৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন, যার ফলে তিনি সাহিত্যে প্রথম এশিয় নারী নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এবং কিং দে-জুংয়ের পর দ্বিতীয় দক্ষিণ কোরীয় নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। তিনি ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ উপন্যাস দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি অর্জন করেন। ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ বইটিতে তিনি সিওলে বসবাসরত ইয়ং হ্যায়ে নামক এক মহিলার গল্প, যিনি আংশিক সময়ের শিল্পী, আবার হোমমেকার। ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হওয়া কাংয়ের প্রথম উপন্যাস, ডেবরা স্মিথ উপন্যাসটিকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন। উপন্যাসে দেখা যায় একজন নারী মানুষের নিষ্ঠুরতা বর্জন করতে মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেন। অনূদিত বইটির জন্য কাং ও স্মিথ ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার অর্জন করেন। বিচারক দলের সভাপতি সাহিত্য সমালোচক বয়েড টনকিন বলেন, ‘হানের ‘নিবিড়, সূক্ষ্ম ও গোলমেলে’ উপন্যাসটি ‘সৌন্দর্য ও ভয়ের অদ্ভূত মিশ্রণ’ প্রদর্শন করেছে। কাং এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত প্রথম কোরীয় ব্যক্তি। ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউ-এর ‘২০১৬ সালের সেরা ১০ বই’ তালিকায় নির্বাচিত হয়। হান কাং নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন গভীর কাব্যিক গদ্যের মধ্য দিয়ে মানব জীবনের ভঙ্গুরতা ও স্মৃতির গহীনে বয়ে বেড়ানো বিবিধ ঐতিহাসিক ভীতির চিত্রায়ণে। নোবেল কমিটির ঘোষণায় ছিল হান কাং পুরস্কার পাচ্ছেন “for her intense poetic prose that confronts historical traumas and exposed the fragility of human life”। কাব্যগুণ সত্যিই তাঁর গদ্যের বড় সম্পদ। The White Book আত্মজীবনীমূলক গদ্য হলেও আদতে কবিতাই। ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ বইটি শুরু হচ্ছে হান কাংয়ের তৈরি করা একটা তালিকা দিয়ে, “In the spring when I decided to write about white things, the first thing I did was to make a list”। তারপর পরপর আসছে Salt Snow Ice Rice Waves। জেনি রিডেন সুইডিশ অ্যাকাডেমির হয়ে ফোন করেছিলেন। হান কাং সুন্দর বাচনভঙ্গিতে উত্তর দিচ্ছিলেন সব প্রশ্নের। শান্ত সংযতভাবে। তিনি কীভাবে celebrate করবেন? কাং বললেন, ফোনটা রেখে দিয়েই এক কাপ চা খাব। আমি তো মদ্যপান করি না, ওই ছেলের সঙ্গে একটু চা খাওয়া— ‘After this phone call I’d like to have tea— I don’t drink. I’m going to have tea with my son’। একটা অকল্পনীয় নির্লিপ্ততা আর নিরাসক্তি যা তাঁর দার্শনিক ভাবনায় প্রতিফলিত এবং সঙ্গতভাবেই তাঁর লেখা উপন্যাসেও। ‘কবিরে পাবে না তার জীবন চরিতে।’ কিন্তু হান কাং বলতেই পারতেন, ‘আমার জীবনই আমার সাহিত্য। চরিত্র সংখ্যা কম, ঘটনার নাহি ঘনঘটা, একই ঘটনা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা, নানা দিক থেকে আলো দিয়ে চরিত্রদের ত্রিমাত্রিক এবং স্পর্শযোগ্য করে তোলা— তাঁর রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
সাধারণ গৃহবধু ইয়োং হে কী একটা স্বপ্ন দেখেছে। তারপর থেকে নিরামিষাশী স্ত্রীকে নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড। ‘Before my wife turned vegetarian I’d always thought of her as completely unremarkable in every way’ এই কথা দিয়ে শুরু উপন্যাসটি। আমিষাশী কোরিয়ান সমাজে তর্কের ঝড়, নানা সংঘাত যুক্তি— কিন্তু অনড় গৃহবধূ, ক্রমশ সে একটি গাছে পরিণত হচ্ছে। কাফকার মেটামরফোসিসকেও হার মানায়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, নগর জীবনের জটিলতা আর উপকথার মেলবন্ধনে এ এক নূতন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে। এ রচনা আধুনিক কোরিয়ান সমাজের জন্য। উপন্যাসে পরিচ্ছদ বদলে যায় বার বার, বদলে যায় কথকও। একই পরিবারের বিভিন্ন সদস্য কথক। শৃঙ্খলিত কোরিয়ান নারীদের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য অর্জন করতে প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ, আর তার গাঢ় লাল রঙ বর্ণিল করেছে নারী চরিত্রদের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জাপান কর্তৃক যে ঔপনিবেশিক অত্যাচার কোরিয়া সহ্য করেছে, তারই অভিঘাতে নিজের এক কবিতায় লিখেছিলেন— ‘আমি বিশ্বাস করি, মানুষের উচিত ধীরে ধীরে বৃক্ষে পরিণত হওয়া।’ হান কাং-এর বুকার পুরস্কার জয়ী উপন্যাস ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’-এ এই দর্শনের ছায়া অনুভব করা যায়। ‘দ্য ভেজিটারিয়ান’ তিনটি পর্বে বিভক্ত। ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখে অসুস্থ হওয়ার পর মাছ–মাংস খাওয়া ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ইয়েয়ং হাই নামের এক বিবাহিত নারী। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে তার স্বামী চেইয়ং দেখতে পায় ফ্রিজ থেকে সব প্রাণিজ আমিষ খাদ্য ফেলে দিচ্ছে সে। নিজে নিরামিষভোজী হয়েই ইয়েয়ং ক্ষান্ত নয়, স্বামীর জন্যও মাছ–মাংস রাঁধতেও সে অস্বীকৃতি জানায়। শান্তভাবে বলে যে, দিনের মধ্যে দুই বেলাই যেহেতু চেইয়ং বাইরে খাওয়াদাওয়া করে, তাই এক বেলা নিরামিষ খেলে তার এমন কিছু ক্ষতি হবে না। সহিংসতাপ্রসূত মানসিক ট্রমার শিকার এক নারীর খাবার টেবিলে মাংস খেতে অস্বীকৃতি জানানোর মধ্য দিয়ে যার শুরু, যে নারী জল ছাড়া সবরকমের কঠিন খাবার খাওয়াই বন্ধ করে দেয় পরবর্তী সময়ে। মানুষের নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদে এক নারীর নিজের খাদ্যাভ্যাসে এরকম অস্বাভাবিক পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্তে তার পুরো পরিবারে ভাঙন ধরে। হান সুনিপুণ দক্ষতায় কোরিয়ান পারিবারিক জীবনের ভঙ্গুরতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন উপন্যাসটিতে। স্বপ্ন ভেঙে জেগে ওঠার পর প্রাণীহত্যা আর মাংস ভক্ষণের পুরো প্রক্রিয়াটি অস্বাভাবিক নিষ্ঠুর বলে মনে হয় তার কাছে। যদিও প্রতি বেলা মুরগি, গরু, শূকর, অক্টোপাসসহ নানা ধরনের মাছ–মাংস সব সময়ই ছিল তাদের খাদ্যতালিকায়। ইয়েয়ং হাই নিজে খুব ভালো রাঁধুনি। ছোটবেলায় মায়ের কাছে প্রায়ই ওয়েস্টার খাবারের জন্য বায়না করত।
দ্বিতীয় পর্বে ‘মঙ্গোলিয়ান মার্ক’ লেখা হয়েছে সর্বদ্রষ্টা বক্তার (ওমনিশ্যান্ট ন্যারেটর) ভাষায়। এখানে মূল দৃষ্টিভঙ্গি ইয়েয়ং হাইয়ের ভগ্নিপতির। আর তৃতীয় পর্ব ‘ফ্লেইমিং ট্রিজ’–এর বক্তা ইয়েয়ং হাইয়ের বোন ইন হাই। তিনটি অংশের মাঝখানে সময়ের ব্যবধান দুই বছর করে। মূল চরিত্রের সরাসরি বক্তব্য খুব অল্প পরিমাণ হলেও তার প্রাণীহত্যা নিয়ে পরিবর্তিত মনোভাব অনেকটাই বোঝা যায়। নিজে খাওয়ার জন্য অন্য প্রাণকে ধ্বংস করার ব্যাপারটি সহ্য করতে না পারা ইয়েয়ং একপর্যায়ে স্বামীর ‘শরীরে মাংসের গন্ধ’ পায় বলে তার সঙ্গে যৌন সংসর্গও ত্যাগ করে। স্বামীর বয়ানে জানা যায়, এই প্রত্যাখ্যানের ফলে ইয়েয়ংকে বৈবাহিক ধর্ষণের শিকার পর্যন্ত হতে হয়। ইয়েয়ং হাইয়ের নিজের শরীর ও জীবনের ওপর তার অধিকার না থাকার বিষয়টির উল্লেখ করে এ আখ্যানকে তার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াই হিসেবে দেখেছেন ‘দ্য ইনডিপেনডেন্ট’–এর বিশ্লেষক জুলিয়া পাসকাল। ‘দ্য অস্ট্রেলিয়ান’ বইটিকে অদ্ভূতুড়ে বা ‘আনক্যানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ‘গ্যাজেট ভ্যান আনটওয়েরপেন’ বলেছে, এটি হারুকি মুরাকামির ভক্তদের জন্য উপযোগী এক বই। আবার ‘দ্য আইরিশ টাইমস’ একে দেখছে নারীদের প্রতি নিষ্ঠুরতার আখ্যানরূপে। আর ‘দ্য গার্ডিয়ান’–এর মতে, এই উপন্যাস নানা পীড়াদায়ক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ অবলম্বনে একই নামে ২০০৯ সালে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন লিম উ সিয়ং। বুসান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ছবিতে দেখানো হয়, ইয়েয়ং হাই নামের এক নারী ফুল হয়ে যেতে চায়। লেখক নিজে তাঁর প্রিয় কবি ই স্যাংয়ের চরণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভেবেছিলেন, মানুষের আদতে গাছ হওয়া উচিত। বুকার পুরস্কার পাওয়ার পর কাং বলেছিলেন, তিনি নিজেও ভাবেননি ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ এত বেশি পাঠকপ্রিয়তা পাবে; বিশেষত ভিন্ন সংস্কৃতির নারী পাঠকদের কাছে প্রশংসিত হওয়ার ব্যাপারে তাঁর কথা ছিল, ভেজিটেরিয়ান–এর কেন্দ্রীয় চরিত্র বিশেষভাবে কোরিয়ান নয়; বরং এটি যে কোনো দেশের নারীরই গল্প হতে পারে। উপন্যাসটিকে কেউ পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি রূপক প্রতিবাদ হিসেবে দেখতে চাইলেও আপত্তি করেননি লেখক।
অন্যদিকে হান কাংয়ের আরেক উপন্যাস ‘হিউম্যান অ্যাক্টস’ লেখা হয়েছে দ্বিতীয় পুরুষের বর্ণনায়। ইতিহাসভিত্তিক এ উপন্যাসের ভাষা আদতে কাব্যিক। ছয়টি অধ্যায়, আর শেষে উপসংহার নিয়ে মোট সাত খণ্ডের উপন্যাসটিতে আছে চুন ডু হুয়ান নামের এক সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী কিশোরের গল্প। স্কুলপড়ুয়া কিশোর দং হো ১৯৮০ সালের মে মাসে জড়িয়ে পড়ে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে দানা বাঁধা গণতন্ত্রকামীদের আন্দোলনে। পরবর্তী অধ্যায়গুলোয় পাল্টে যায় পরিপ্রেক্ষিত। জেয়ং দে নামের আরেক নিহত কিশোরের বয়ানে এগোতে থাকে কাহিনি। পড়তে পড়তে কারও মনে পড়তে পারে ওরহান পামুকের ‘মাই নেম ইজ রেড’–এর কথা। এখানে নামহীন লেখকের চরিত্রটি হতে পারেন হান কাং নিজেই, যিনি গোয়াংজু অভ্যুত্থানের কিশোর শহিদ দং হোর কবরে মোমবাতি জ্বালিয়ে সম্মান জানিয়ে আসেন। তারপর সিওলে ফিরে উপন্যাস লিখতে শুরু করেন আন্দোলনের শহিদদের নিয়ে। এক স্বৈরাচারী শাসকের হাতে ১৯৮০ সালের দক্ষিণ কোরিয়া, তার সীমাহীন অত্যাচারের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন। হান কাং তখন ন’বছরের শিশু। উপন্যাসটিতে দুই ভাইবোনের হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া দং হো খুঁজতে এসেছে বন্ধুকে। ২০টি মৃতদেহের মধ্যে। হিমশীতল বর্ণনা— সৈন্যদের গুলিতে নিহতদের সাজিয়ে রাখছে আত্মীয়দের দেওয়ার জন্য। মৃতদেহগুলির মুখ ধুয়ে দেওয়া, চুল আঁচড়ানো, আরও কত সব কাজ— ঠিক যেমন বেঁচে থাকলে করা হয়। হান শাসকের স্বৈরাচার বা নির্মম হত্যালীলা নিয়ে একটা শব্দও খরচ করেননি। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ দেখে পাঠকের নীরব দর্শক হয়ে থাকার উপায় নেই। উপন্যাসটিতে মানুষ কী? ব্যক্তিমানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া কী? দুঃখ কেন মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ?— এরকম যে প্রশ্নগুলো, হানের নিজের ভাষ্যে, তাঁকে তাড়িয়ে ফিরেছে শৈশব থেকে, একদম খোলামেলাভাবে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে এসকল জিজ্ঞাসার মুখোমুখি করেন তিনি নিজেকে। এই অত্যন্ত ব্যক্তিগত এক উপন্যাসে। হান কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করেন তাঁর ঔপন্যাসিক বাবার কথা, যিনি হানকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, কষ্ট করে হলেও হান যেন তাঁর এই শৈশবের ভীতির মুখোমুখি হন। উপন্যাসটি লিখে শেষ করেন। আতঙ্ক, সন্দেহ, বীভৎসতার ছবি হান কাং ফুটিয়ে তুলেছেন মন্থর গতিতে এগোনো কাহিনিতে, আর সেই বৌদ্ধিক নিরাসক্ততায়। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে পোর্টোবেলো বুকস থেকে তাঁর উপন্যাস ‘হিউম্যান অ্যাক্টস’ প্রকাশিত হয়। বইটি ২০১৭ সালে ১ অক্টোবর ইতালির আদেলফি এদিজোনি থেকে ইতালীয় ভাষায় ‘আত্তি উমানি’ শিরোনামে অনূদিত হয়, যার জন্য কাং ২০১৭ সালে মালাপার্তে পুরস্কার অর্জন করেন।
হান কাংয়ের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘দ্য হোয়াইট বুক’ তাঁর বড় বোনকে কেন্দ্র করে লেখা, যে জন্মের দুই ঘন্টা পর মারা গিয়েছিল। উপন্যাসটি ২০১৮ সালের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের ক্ষুদ্রতালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০২৩ সালে তাঁর উপন্যাস ‘গ্রিক লেসনস’ ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়। মার্কিন পত্রিকা ‘দ্য আটলান্টিক’ বলে, বইটিতে ‘শব্দগুলো বশে আনার জন্য অপ্রতুল ও খুবই শক্তিধর’। হানের ‘উই ডু নট পার্ট’ উপন্যাসটি ২০২১ সালে প্রকাশিত হয়। বইটিতে একজন লেখকের গল্প বর্ণিত হয়েছে, যিনি ১৯৪৮-৪৯ সালের জেজু বিদ্রোহ ও তাঁর বন্ধুর পরিবারে এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। বইটির ফরাসি অনুবাদ ২০২৩ সালে ‘প্রি মেদিসি এত্রঁজে’ অর্জন করে। আধুনিক কোরিয়ান সাহিত্য একদল প্রতিভাবান লেখকের প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিপক্কতা লাভ করেছে। তাঁরা তাঁদের শিল্পকে সমৃদ্ধ করার জন্য ইউরোপীয় উদাহরণের উপর অবাধে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। পাশ্চাত্য সাহিত্যের অনুবাদ অব্যাহত থাকে এবং আইএ রিচার্ডস, টিএস এলিয়ট এবং টি হিউমের রচনাগুলি প্রবর্তিত হয়। এই শৈল্পিক এবং সমালোচনামূলক কার্যকলাপ ছিল সাহিত্যকে সাংবাদিকতায় পরিণত করা এবং বামপন্থী লেখকদের দ্বারা প্রচারণা হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। আধুনিক কোরিয়ান সাহিত্য একদল প্রতিভাবান লেখকের প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিপক্কতা লাভ করেছে। তাঁরা তাঁদের শিল্পকে সমৃদ্ধ করার জন্য ইউরোপীয় উদাহরণের উপর অবাধে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। পাশ্চাত্য সাহিত্যের অনুবাদ অব্যাহত থাকে এবং আইএ রিচার্ডস , টিএস এলিয়ট এবং টিই হুলমের রচনাগুলি প্রবর্তিত হয়, এই শৈল্পিক এবং সমালোচনামূলক কার্যকলাপ ছিল সাহিত্যকে সাংবাদিকতায় পরিণত করা এবং বামপন্থী লেখকদের দ্বারা প্রচারণা হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কেউ কেউ ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান মূল্যবোধকে আরও আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছিলেন, আবার কেউ কেউ তাঁদের কাজকে সমৃদ্ধ করার জন্য পশ্চিমা ঐতিহ্যের উপর বিভিন্নভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ভাষার লুকানো সম্পদ অন্বেষণ করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আনন্দ, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান থেকে কথ্য পার্থিবতা পর্যন্ত সবকিছুকেই। ইতিহাসের দ্বারা কোরিয়ান জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া আদর্শিক পার্থক্যগুলি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব যদি লেখকরা সেই স্থানীয় ঐতিহ্যগুলিতে গভীরভাবে অনুসন্ধান করেন যা তাঁদের ঐক্য দিয়েছে। হান কাং বলেন, তাঁর গদ্য কাব্যে আক্রান্ত এবং এই কাব্যিকতা সচেতন নয়, বরং অবচেতনে অনুপ্রবেশ করে, দখল করে নেয় তাঁর গদ্যের পৃথিবী। তাঁর জটিল গল্পের বুনোটের মাঝে ভাষার কাব্যিকতা ঠিক অনুমোদিত অভিবাসীর মত ঢুকে পড়ে।