• facebook
  • twitter
Saturday, 5 April, 2025

কেন তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীও জানালেন মমতা

কেন তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরটি নিজের হাতে রেখেছেন, সোমবার চিকিৎসকদের সম্মেলনে সেই বিষয়ে খোলসা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

রাজ্যের বেশ কিছু দপ্তরের সঙ্গে স্বাস্থ্য দপ্তরও সামলান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরটি নিজের হাতে রেখেছেন, সোমবার চিকিৎসকদের সম্মেলনে সেই বিষয়ে খোলসা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতার সাফ বক্তব্য, স্বাস্থ্য দপ্তরের কাজের পরিসর এতটাই বড় যে, তার সমস্ত খুঁটিনাটির দিকে নজর রাখতে হয়। একজন রাজ্যমন্ত্রীর পক্ষে স্বাস্থ্য বিভাগের উন্নয়নের কাজ দেখাশোনা করা সম্ভব নয় বলেই তিনি মনে করেন। সেই কারণেই নিজের হাতেই স্বাস্থ্য দপ্তর রেখেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। এই প্রসঙ্গে বাম জমানার স্বাস্থ্য দপ্তরের অচলাবস্থার কথাও তুলে ধরেছেন।

মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, বাম জমানায় রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে চূড়ান্ত অবহেলা করা হয়েছিল। তৃণমূল রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যে আমূল পরিবর্তন এসেছে সে কথাও বলেছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ছোট ছোট গেট ছিল ফলে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে তাড়াতাড়ি রোগীকে বার হওয়ার উপায় ছিল না। বর্তমান সরকারের আমলে হাসপাতালের গেটগুলি বড় করে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালগুলিকে রং করা হয়েছে এবং সেখানে রোগীর পরিজনদের জন্য রাতের থাকার জায়গা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি টেলিমেডিসিন পরিষেবা এবং স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে সরকারের সাফল্যের কথাও তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

চিকিৎসকদের সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে আরজিকর-কাণ্ডে দোষীর যোগ্য শাস্তির দাবি থেকে শুরু করে জুনিয়র ডাক্তারদের বেতন, মেদিনীপুর মেডিক্যালের স্যালাইন-কাণ্ড, সরকারি হাসপাতালে নিয়োগ সংক্রান্ত সমস্যা-সহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে।

মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে ‘রিঙ্গার্স ল্যাকটেট’ স্যালাইন ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তা নিয়ে মামলাও হয়েছে আদালতে। চিকিৎসকদের সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, মেদিনীপুরের ঘটনায় গাফিলতি নিশ্চয়ই ছিল। সেটির তদন্ত চলছে। এই বিষয়ে এর বেশি কিছু বলতে চাননি মুখ্যমন্ত্রী। এই ঘটনার সময় যে স্বাস্থ্য ভবন ৭ জুনিয়র ডাক্তার সহ ১৩ জন চিকিৎসককে সাসপেন্ড করেছিল, সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে জানিয়েছেন তিনি। এছাড়াও মেয়াদ-উত্তীর্ণ ওষুধ বা স্যালাইন যাতে কোনও হাসপাতালে না-থাকে, সে জন্য ৩ মাস অন্তর যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছেন মমতা।

এরপরই দলমত নির্বিশেষে চিকিৎসকদের একত্রিত হয়ে কাজ করার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, চিকিৎসকদের একটিই রং। তা হল মানবতার এবং সেবার। সম্মেলনে মমতা বলেছেন, ‘আমাদের সরকার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ডাক্তারদের সম্মান করে।’ অনুরূপভাবে চিকিৎসকদেরও রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

রাজ্যের ওবিসি শংসাপত্র সংক্রান্ত একটি মামলা বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। এই প্রসঙ্গ উঠে আসে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তৃতায়। তিনি জানিয়েছেন, ওই মামলার কারণে চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষক-সহ বিভিন্ন সরকারি কাজে নিয়োগ থমকে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া জেলা হাসপাতালগুলি থেকে যাতে রোগীদের কলকাতার হাসপাতালে না পাঠানো হয়, সেই প্রস্তাবও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

ধনধান্য প্রেক্ষাগৃহে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে আর জি কর প্রসঙ্গও। আরজি করে নির্যাতিতার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। রাজ্য সরকার যে দোষীর উপযুক্ত শাস্তির পক্ষে, তা-ও মনে করিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী, সেই সঙ্গে এই ঘটনা ঘিরে চিকিৎসক সমাজের একাংশের সঙ্গে দৃশ্যত কিছুটা দূরত্বও তৈরি হয়েছিল সরকারের। সোমবার চিকিৎসক সম্মেলন থেকে সেই দূরত্ব ঘোচানোর চেষ্টা করেছে মুখ্যমন্ত্রী।

এরপর উঠে আসে হাসপাতালে নিরাপত্তার প্রসঙ্গও। চিকিৎসকদের তরফে বেশ কিছু প্রস্তাব জমা পড়েছে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। এই বিষয়ে মঞ্চে থাকা রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মাকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আরও বেশি নজরদারি এবং প্রয়োজনে পুলিশের মোবাইল ভ্যান বৃদ্ধির কথাও বলেছেন তিনি। হাসপাতালের নিরাপত্তার জন্য নতুন নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদেরও ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন মমতা।

স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় উন্নয়ন নিয়েও এদিনের সম্মেলনে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। হাসপাতালগুলির পরিকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগের কথাও চিকিৎসকদের বোঝান মুখ্যমন্ত্রী। আরজি কর, এসএসকেএম এবং মেদিনীপুর কলেজে হস্টেল তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি হাসপাতালে মহিলাদের শৌচালয়ে বা হস্টেলে কোনও সমস্যা রয়েছে কি না, সে দিকেও নজর রাখার জন্য অধ্যক্ষদের পরামর্শ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই রাজ্যে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৩৮টি মেডিক্যাল কলেজ, ৪২টি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল করা হয়েছে। ১৩ হাজার ৫০০-র বেশি সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র করা হয়েছে, আগামীতে আরও ১২ হাজার সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র করা হবে।