ইসকনের প্রধান কেন্দ্র শ্রীধাম মায়াপুরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নবম বর্ষ জনজাতি সম্মেলন (ট্রাইবাল ফেস্টিভ্যাল)। ২১ থেকে ২৩ মার্চ তিনদিনব্যাপী এই সম্মেলনে ভারতের ১০টি রাজ্য থেকে প্রায় ২,৫০০ জনজাতি অর্থাৎ আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া মানুষ অনুষ্ঠানে সামিল হন। ইসকনের শ্রীধাম মায়াপুরে তাঁদের সাদরে আপ্যায়িত ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। এই তিনদিনে তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি, শিক্ষা, চিরাচরিত ভাবধারার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হয়। রবিবার বিশেষ এই অনুষ্ঠানের তৃতীয় দিনে তেলেঙ্গানার রাজ্যপাল শ্রী যিষ্ণু দেব ভার্মা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সর্বজীবের প্রতি যে করুণা প্রদর্শন করেছিলেন, তাঁর সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরাও যেন বর্তমান সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে একাত্মভাবে চলতে পারেন, তাঁরা কেউই পর নন, সকলেই সমাজের একান্ত আপনজন, সেটি যাতে তাঁরা অনুভব করতে পারেন, অনুষ্ঠানে সেটি আলোকপাত করাই এই সন্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল। সেই সঙ্গে জনজাতি সমাজের সহজ, সরল জীবন-যাপন শ্রীধাম মায়াপুরের মঞ্চে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়।
ভারতবর্ষের ১০টি রাজ্য যেমন পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খন্ড, মণিপুর, অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম প্রভৃতি পিছিয়ে পড়া জনজাতি আদিবাসীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষ্ণভাবনা গড়ে তুলতে ইসকন সারাবছরব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে থাকে। বিভিন্ন রাজ্যে জনজাতির উন্নতিকল্পে যে সমস্ত অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ স্বয়ং ফিল্ডে কাজ করছেন, এদিন তাঁরা তাঁদের অভিজ্ঞতালব্ধ মনোজ্ঞ ভাষণ দেন এবং বিভিন্ন বিষয়ের উপর সেমিনার হয়। ত্রিপুরাবাসী যিষ্ণু দেব ভার্মাও এই অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দানের সময় দেশের আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া সমাজের উন্নতি কল্পে বিভিন্ন কর্মকান্ডের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
প্রসঙ্গত এই সকল রাজ্যগুলির জনজাতি আদিবাসী শিশুদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে বর্তমানে ইসকনের মোট ১২১টি পাঠশালা ও ৮টি স্কুল চলছে, যেখানে প্রায় ৫,৫০০ জন ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ২৮০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষাদান করে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের জনজাতি অধ্যুষিত পিছিয়ে পড়া জেলাগুলি যেমন- পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম প্রভৃতি জেলায় আদিবাসী শিশুদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে ‘নিমাই পাঠশালা’ নির্মাণ করা হয়েছে। মোট ১২৩ টি পাঠশালায় ১৫২ জন শিক্ষক শিক্ষিকা প্রায় ৩০০০ ছাত্র ছাত্রীদের শিক্ষাদান করেন। তাঁদের এই পাঠশালায় থাকা ও খাওয়ার সুব্যবস্থা করা হয়েছে। ইসকনের উদ্যোগে এই আদিবাসী এলাকায় সারা বছরব্যাপী মেডিক্যাল ক্যাম্প, স্বাস্থ্য সচেতনতা ক্যাম্প, সামাজিক সুরক্ষা ও পরিশ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হয়। গত বছর ৬০০০ জন জনজাতি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা পেয়েছেন।
এছাড়া ইসকনের উদ্যোগে প্রতিবছর শীতের সময় জনজাতি আদিবাসী এলাকার মানুষদের শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়ে থাকে। পিছিয়ে পড়া এই মানুষদের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে স্বাস্থ্য-পরিকাঠামো গড়ে তোলা ও মেডিক্যাল সরঞ্জাম বিতরণ করা হচ্ছে। গত বছর আসামের বন্যায় ১২ দিনব্যাপী ‘আশ্রয় হস্ত ট্রাস্ট’-এর সহযোগিতায় ৩৬০০০ মানুষের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে দ্রুত চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিতে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী এই পিছিয়ে পড়া জনজাতি আদিবাসীদের স্বাস্থ্য-সম্মত শিক্ষা, তাঁদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের যথোপযুক্ত সংরক্ষণ ও তাঁদের মধ্যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রতি ভক্তিভাব ও সাম্যবাদ গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইসকন।