• facebook
  • twitter
Friday, 4 April, 2025

ফের কি দলে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করতে চলেছেন মমতা?

২৭ ফেব্রুয়ারির বৈঠক

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

সাড়ে চার বছর পর ফের কি তৃণমূলে ফিরতে চলেছে পর্যবেক্ষক পদ? বৃহস্পতিবার নেতাজি ইন্দোরে দলের মহা বৈঠককে কেন্দ্র করে সেই গুজব তীব্র হয়েছে। অনেকের ধারনা, বিধানসভা নির্বাচনের পূর্বে দলের এই পুরনো রীতি ফিরিয়ে এনে দলকে আরও ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করতে চাইছেন সুপ্রিমো।

প্রসঙ্গত ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকেই দলের ভিতরে নজরদারি বাড়াতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হতো। এই পদগুলির মাধ্যমে দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি দলের রাশ নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। মূলত রাজ্য নেতারা এই পদে নিযুক্ত হতেন। তাঁদের কাজ ছিল জেলা সংগঠনের তদারকি করা। তবে ২০২০ সালে এই পদের বিলুপ্তি ঘটে। এই সময়ে করোনা পরিস্থিতিতে তৃণমূলের একটি ভার্চুয়াল সমাবেশ হয়। সেই সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যবেক্ষক পদের বিলুপ্তি ঘোষণা করেন। প্রায় সাড়ে চার বছর বাদে দলকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করতে পুরনো কৌশলে ফিরে যেতে চাইছে বলে তৃণমূল সূত্রের খবর। আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহাবৈঠকের ডাক দেওয়ার পরেই শাসকদলের অন্দরে সেই জল্পনা শুরু হয়েছে।

কিন্তু ২০২০ সালে কেন এই পদের বিলুপ্তি ঘটানো হয়েছিল, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিভিন্ন জল্পনা শুরু হয়, অনেকে ধারনা করেন, রাজ্যের তৎকালীন মন্ত্রী ও বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারীর ক্ষমতা হ্রাস করতে এই পদ বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পদ বিলুপ্তির পিছনে ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শও ছিল বলে সূত্রের খবর। যদিও বর্তমানে প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে তৃণমূলের কোনও যোগাযোগ নেই বলে মনে করা হয়। আবার শুভেন্দু অধিকারীও পরবর্তীতে বিজেপি-তে যোগদান করে বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করেন। বর্তমানে তিনি এখন বিরোধী দলনেতা।

চলতি বছর ঘুরতেই ২০২৬-এ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন। ২৭ ফেব্রুয়ারি সেই নির্বাচনের ‘প্রস্তুতি বৈঠক’ রয়েছে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে। বৃহস্পতির সেই বৈঠকে থাকছেন তৃণমূলের সর্বস্তরের নেতারা। এদিন সভা শুরু হবে সকাল ১১টায়। দলের গাইডলাইন মেনে রাজ্যের সব প্রান্ত থেকে প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। প্রায় ১৪ হাজার নেতা কর্মী এই সভায় অংশগ্রহণ করবেন। বিশেষ এই সাংগঠনিক অধিবেশনে কী বার্তা দেন তা জানতে মুখিয়ে রয়েছেন রাজ্যবাসী তথা তৃণমূলের নেতা কর্মীরা। আগামী দিনে জাতীয় ও রাজ্যস্তরে দল কোন পথে চলবে এবং বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে দলনেত্রী তার দিকনির্দেশ করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলের রাশ নিজের হাতে নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই কারণেই তৃণমূলের ‘আদি’ নেতাদের অনেকেই অনুমান করছেন, দলনেত্রী নিজের পুরনো ফর্মুলায় ফিরে যেতে পারেন। সেজন্য তিনি রাজ্যস্তরের নেতাদের পর্যবেক্ষক পদে নিয়োগ করে সংগঠনের ঘুঁটি সাজাবেন। এদিকে অভিষেক দীর্ঘ দিন ধরেই দলের অভ্যন্তরে সাংগঠনিক রদবদলের দাবি জানিয়ে আসছেন। পর্যবেক্ষক পদ ফেরানোর পাশাপাশি সেই সাংগঠনিক রদবদলও হতে পারে নেতাজি ইন্ডোরের বৈঠকে।

সেই অনুমান যদি সত্যি হয়, তাহলে কে কে পর্যবেক্ষক পদে স্থান পেতে পারেন? এই বিষয়ে বেশ কয়েকজনের নাম এখন দলীয় নেতাদের মুখে মুখে ঘুরছে। এই তালিকা নিয়ে জোর চর্চায় রয়েছেন রাজ্যের ৬ জন শীর্ষ নেতা। এঁরা হলেন সুব্রত বক্সি (রাজ্য সভাপতি), ফিরহাদ হাকিম (মন্ত্রী ও কলকাতার মেয়র), অরূপ বিশ্বাস (মন্ত্রী), মলয় ঘটক (মন্ত্রী), চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য (মন্ত্রী) ও গৌতম দেব (শিলিগুড়ির মেয়র)।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে শহিদ দিবসের সমাবেশ থেকে ২৩ জুলাই একটি ‘ভার্চুয়াল’ বৈঠকের কথা ঘোষণা করেছিলেন মমতা। সেই বৈঠকেই পর্যবেক্ষক পদের বিলুপ্তি ঘটান তিনি। তখন ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানান ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টিকে বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন একসঙ্গে সাতটি জেলার পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুভেন্দুর দল ছাড়া নিয়ে সেই সময়েই একটা চাপা গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছিল। শুভেন্দু শেষ পর্যন্ত তৃণমূলে থাকবেন কি না, সেই নিয়ে সংশয়ে ছিলেন দলীয় নেতারা। এদিকে শুভেন্দুর সঙ্গেও দলের একটি দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। তাই পর্যবেক্ষক পদ তুলে মুখ্যমন্ত্রী আসলে শুভেন্দুর ডানা ছেঁটে দেন বলে ধরে নেওয়া হয়।

তবে দলের একটি অংশের মতে, সেই সময় তৃণমূলের ‘পরামর্শদাতা’ প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শেই পর্যবেক্ষক পদ তুলে দিয়েছিলেন মমতা। তবে প্রশান্তের সঙ্গে তৃণমূলের সম্পর্কের পাট চুকে গিয়েছে। তাই শুভেন্দুর অনুপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী আবার নিজের পুরনো কৌশলেই বিধানসভা ভোট করাতে চান বলে মনে করছেন দলের প্রবীণ বিধায়কদের একাংশ।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের জুন মাসে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দলের সর্বভারতীয় সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের মতো করে দল পরিচালনা করছিলেন। কিন্তু গত বছর লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে তিনি কার্যত ডায়মন্ড হারবারে নিজের কেন্দ্রেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরে গিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে তৃণমূলের ‘আদি’ নেতাদের একাংশের যুক্তি, দলের ‘অভিজ্ঞ এবং প্রবীণ’ নেতাদের আরও সক্রিয় ভাবে সংগঠনের দায়িত্বে ফেরাতে পারেন মমতা। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটকে পাখির চোখ করে মমতা এখন থেকেই সংগঠন মজবুত করতে মাঠে নামতে চাইছেন। ফলে তৃণমূলের সাংগঠনিক রদবদলে ‘পুরনো ও পরীক্ষিত’ নেতাদের গুরুত্ব বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

News Hub