শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা বৈষম্যের অবসান ঘটল পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার গিধাগ্রম গ্রামে। বাংলার এই গ্রাম সাক্ষী রইল এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের। প্রথমবার গ্রামের গিধেশ্বর মন্দিরে প্রবেশ করে পুজো দিলেন দলিতরা। গ্রামের ভিতরে কোনওরকম প্রবেশাধিকার ছিল না দলিত সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের। গ্রামের উচ্চবর্ণের বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়েছিলেন দলিত সম্প্রদায়ের ‘দাস’ পরিবারগুলি। চেয়েছিলেন গ্রামের মন্দিরে তাঁদেরও পুজো করার অনুমতি দিতে হবে। তাঁরা দ্বারস্থ হয়েছিলেন স্থানীয় প্রশাসনের। দেরি করেনি স্থানীয় প্রশাসনও। প্রশাসনের হাত ধরেই দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা ‘অচলায়তন’-এর অবসান ঘটল এই গ্রামে।
কলকাতা থেকে দূরত্ব ৯৩ মাইল। বুধবার সকাল থেকেই দুর্গে পরিণত হয়েছিল পূর্ব বর্ধমানের এই অখ্যাত গ্রামটি। কুসংস্কারের খোলস ছেড়ে নতুন সূর্য উঠল গিধাগ্রম গ্রামে। এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত আগে কখনও দেখেননি গ্রামবাসীরা। গ্রামের দলিত সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা গত কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথমবার স্থানীয় গিধেশ্বর মন্দিরে প্রবেশ করলেন, পুজো দিলেন ভক্তিভরে।
বছর ৫০-এর মমতা দাস এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, ‘মন্দিরে প্রবেশ ও পুজো করার জন্য আমরা যখন ১৬টি সিঁড়ি ভেঙে উঠছিলাম, তখনই প্রজন্মের পর প্রজন্মব্যাপী বৈষম্যের যেন অবসান ঘটল।’ বুধবার মন্দিরে দলিত সম্প্রদায়ের যাঁরা প্রবেশ করেছিলেন তার প্রথম পাঁচজনের মধ্যে মমতা ছিলেন। তিনি ছাড়াও ছিলেন শান্তনু দাস বয়স ৪৫, ষষ্ঠী দাস বয়স ৪৫, ছিলেন লক্ষ্মী দাস বয়স ৩০, এবং ছিলেন ২৭ বছরের পূজা দাস। প্রসঙ্গত, এই গ্রামে বসবাস করেন ৫৫০ জন দলিত বাসিন্দা, যাঁদের এতদিন গ্রামের এই মন্দিরে পা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এদিন মন্দিরের প্রবেশের অধিকার পেয়েছিলেন ষষ্ঠী দাস। তাঁর কাছে এই প্রবেশাধিকার অভাবনীয়। তাঁর কথায়, ‘আমাদের জন্য, এটি একটি ঐতিহাসিক দিন কারণ, এই অঞ্চলের ইতিহাসে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল।প্রথমবারের মতো আমরা এই মন্দিরে আমরা পুজার্চনার অধিকার পেয়েছি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমরা বিতাড়িত হয়ে এসেছি। আমরা যখনই মন্দিরের কাছে যেতাম, আমাদের তাড়িয়ে দেওয়া হত। এমনকি গত বছরও আমি মন্দিরে প্রার্থনা করতে এসেছিলাম, কিন্তু আমাকে গ্রামের মানুষ সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেয়নি। আমি আশা করি আজকের পর আমাদের গ্রামে শান্তি বজায় থাকবে।’
নতুন সূর্য, নতুন ভোরের সূচনা হয়েছিল গ্রামের দলিতদের হাত ধরেই। ওই গ্রামে বসবাস করেন প্রায় ২ হাজার পরিবার। সংখ্যার হিসেবে গ্রামের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশই হলেন এই দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। তাহলে কেন তাঁরা গ্রামের ভিতরে ঢোকার অনুমতি পাবেন না? কেন তাঁরা এখনও অচ্ছুত হয়ে থাকবেন মন্দির তথা ধর্মস্থানে? সেই তাগিদ থেকেই তাঁরা একত্রিত হন এবং জেলা প্রশাসনকে চিঠি লিখে বৈষম্যের কথা জানান। আর তার পরেই উদ্যোগী হয় প্রশাসন।
দলিতদের ডাকে সাড়া দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সাহায্যের হাত। বুধবারের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে ৫ জন দলিতকে দশপাড়ার এসসি পাড়া থেকে ১০ মিনিট দূরের মন্দিরে নিয়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে ছিল পুলিশ, ছিলেন স্বেচ্ছাসেবকরা। মন্দিরে তাঁরা ১ ঘণ্টা ধরে প্রার্থনা করেন। গোটা সময়টাই এলাকা ঘিরে রেখেছিল পুলিশ ও রাপিড অ্যাকশন ফোর্স।
গিধেশ্বর শিব মন্দিরটি আনুমানিক প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। মন্দিরের উপর একটি ফলক রয়েছে যেখানে উল্লেখ করা আছে যে এই মন্দিরের সংস্কার করা হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। স্থানীয় দলিত সম্প্রদায়ের মানুষরা জানিয়েছেন, তাঁরা কয়েক দশক ধরে মন্দিরে প্রবেশের অধিকারের জন্য লড়াই করে আসছেন। কিন্তু সেই চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি, মহাশিবরাত্রির ঠিক আগে তাঁরা জেলা প্রশাসন, ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক এবং জেলা পুলিশকে চিঠি লিখে তাঁদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার জন্য হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন। চিঠিতে তাঁরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, তাঁদের বহু শতাব্দী ধরে ‘অস্পৃশ্য’ হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে আসছে এবং বলা হয়েছে ‘ছোট জাত’ হওয়ায়, তাঁদের উপস্থিতি মন্দিরকে ‘অপবিত্র’ করে তুলবে।
গ্রামের দলিত দাস পরিবারগুলি এও জানান, তাঁদের বহু অনুরোধ সত্ত্বেও, উৎসবের সময় তাঁদের মন্দিরের বাইরেই রাখা হয়েছিল। তারপর, ২৮ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় প্রশাসন এক বৈঠক ডাকেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মহকুমা আধিকারিক-কাটোয়া, দশ পাড়ার বাসিন্দা, মন্দির কমিটি, স্থানীয় বিধায়ক, তৃণমূল কংগ্রেসের অপূর্ব চৌধুরী এবং বিডিও। বৈঠকে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে যে, এই ধরনের বৈষম্য সংবিধানে নিষিদ্ধ। গ্রামের দলিত বাসিন্দাদের মন্দিরে প্রার্থনা করার অধিকার রয়েছে। বলা হয়েছে, প্রত্যেকেরই উপাসনার অধিকার রয়েছে। সুতরাং,দাস পরিবারদের কাটোয়া ১ ব্লকের অন্তর্গত গিধাগ্রামের গিধেশ্বর শিব মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।
অবশেষে সম্মতি মেলে দাস সম্প্রদায়ের পাঁচ সদস্যকে মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার। মেলে ‘পুজো’ করার অনুমতিও। কাটোয়া মহকুমা আধিকারিক অহিংসা জৈন বলেন, এটি একটি দলগত প্রচেষ্টা ছিল। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের বৈষম্যকে প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। এটি একটি সংবেদনশীল বিষয়। আমরা একাধিক বৈঠক করেছি এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের আশ্বস্ত করেছি।’
স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, যে অচলায়তনের অবসান ঘটেছে, তার আর পুনরাবৃত্তি হবে না। দলিতদের মন্দিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া অব্যাহত থাকবে। মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক মিন্টু কুমার বলেন, ‘যে রীতি ও ঐতিহ্য ছিল আজ তা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি তারা এখানে প্রার্থনা চালিয়ে যেতে পারবেন।’ অস্পৃশ্যতার অন্ধকার কাটিয়ে তাই নতুন সূর্যের আলোয় আলোকিত পুূর্ব বর্ধমানের গিধাগ্রাম।